|
পতনের অন্তরালের গল্প : দুবাই-লন্ডন-আমেরিকায় সম্পদ ও শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
অলিম্পিক সিমেন্ট বন্ধের নেপথ্যে : ঋণ সংকট, বিদেশে সম্পদ, অর্থপাচার ও ভ্যাট জালিয়াতি!
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের পরিচিত প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের উৎপাদন বন্ধের ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা, ব্যাংক ঋণ, শ্রমিক পাওনা এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর, ভ্যাট ফাঁকি, ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি এবং অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই তদন্তাধীন।
অলিম্পিক সিমেন্ট বন্ধের পেছনে কী?
অলিম্পিক সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কাঁচামাল সংকট, ঋণের চাপ, এলসি জটিলতা এবং ধারাবাহিক ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংকটের পেছনে শুধু ব্যবসায়িক লোকসান নয়, বরং দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ব্যাংক ঋণ, শ্রমিক পাওনা এবং বিদেশে অর্থপাচারের কারণে। তাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হতে থাকে। একই সময়ে বাজার থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ, অতিরিক্ত কমিশনের প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।
অর্থপাচারের অভিযোগ :
একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাত রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ব্যবসা, আবাসিক সম্পত্তি এবং বিনিয়োগে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এলসি লেনদেন ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংযোগ :
কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র অভিযোগ করেছে, বিদেশে প্রতিষ্ঠিত একই নামের কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি ও এলসি লেনদেনে অতিমূল্যায়নের (Over-Invoicing) মাধ্যমে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত সংস্থাগুলো এসব অভিযোগ যাচাই করছে বলে জানা গেছে।
ভ্যাট ফাঁকি ও শুল্ক জালিয়াতির অভিযোগ :
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা গ্রহণ এবং বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির সঙ্গে জড়িত । এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য কোম্পানিকে তলব করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ :
সম্প্রতি এক প্রবাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের পর বিদেশে সম্পদ অর্জন, নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমে কোম্পানির অর্থ এবং ব্যাংক ঋণের অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে ।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ :
কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অর্থ স্থানান্তরে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। আনিকা রহমান ও তার স্বামী রিফাতের বিরুদ্ধে দুবাই, শারজাহ এবং নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তরে সহায়তা করেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পিএস নিলুফা, পরিচালকের পিএস জুয়েল ইসলাম, সিওও শাহেদ উদ্দিন, মার্কেটিং প্রধান ইমাম ফারুকী, সেলস মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান, ভ্যাট ব্যবস্থাপক মোস্তফা ও রিয়াজসহ আরো অনেকেই। সহায়তা করার জন্য এসব কর্মকর্তারা হয়েছেন ক্রোড়পতি। গড়েছেন নামে বেনামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সহায় সম্পদ।
ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক চাপ :
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকের বিপুল ঋণ বকেয়া থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঋণের চাপ, নতুন এলসি খুলতে অক্ষমতা এবং কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতার কারণে উৎপাদন বন্ধ ছিল।
শ্রমিকদের উদ্বেগ :
শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্তের ফলে শত শত শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। তাদের দাবি, মালিকানা পরিবর্তন হলে নতুন মালিককে শ্রমিকদের চাকরি বহাল রাখতে হবে এবং বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পাওনা দ্রুত পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে হবে। শ্রমিক নেতাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েকশ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন, যাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যেসব প্রশ্ন :
অলিম্পিক সিমেন্টের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং কর্পোরেট সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
তদন্ত সংস্থাগুলোর সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে :—
• উৎপাদন বন্ধের কারণ কি শুধুই ব্যবসায়িক লোকসান?
• ব্যাংক ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে?
• এলসি লেনদেনে কোনো অনিয়ম বা অতিমূল্যায়ন হয়েছিল কি?
• ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?
• শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা কীভাবে পরিশোধ করা হবে?
• অর্থপাচারের অভিযোগের পক্ষে তদন্তকারীরা কী ধরনের তথ্য পেয়েছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে দুদক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অন্যান্য তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ওপর।
দেশের শিল্পখাতের অন্যতম আলোচিত এই ঘটনাটি ইতোমধ্যেই কর্পোরেট জবাবদিহিতা, ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র : ইত্তেহাদ নিউজ
Post Views: ০
|