মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে বিদ্যুতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং অনিয়মিত সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। আবার কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। কোথাও দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীদের কষ্ট বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিল্পকারখানার উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন খাতের কার্যক্রম। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকরাও সময়মতো চার্জ দিতে না পেরে আয় হারাচ্ছেন। পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোকে দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৮২১ মেগাওয়াট। একই দিন দুপুর ৩টায় ১৬ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। এর আগে শনিবার রাত ৩টায় ১৫ হাজার ৩৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩ হাজার ১৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রধান প্রকৌশলী জানান, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। সাম্প্রতিক সংকটের আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন তা প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গতকাল বিদ্যুৎ খাতে পেট্রোবাংলা গ্যাস দিয়েছে ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সবচেয়ে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেখানে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। উপজেলার বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৯ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট। রাতে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার পর এক ঘণ্টা সরবরাহ করা হচ্ছে। দিনের বেলায়ও প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতেও পরিস্থিতি নাজুক। সেখানে ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল সন্ধ্যায় স্থানীয় বাসিন্দারা পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। যশোরের অভয়নগরে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। রাজবাড়ী শহরে গতকাল সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পাঁচ দফা বিদ্যুৎ গেছে। সেখানে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। জেলার গোয়ালন্দে কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনাও ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জে গতকাল ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা পরপর সাত দফা লোডশেডিং হয়েছে। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ গেছে। উপজেলার কোনো কোনো এলাকায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত টানা বিদ্যুৎ ছিল না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে এক ঘণ্টা পরপর এবং গ্রামাঞ্চলে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটাতেও ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প মালিকদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদনযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ এলে আবার যন্ত্রপাতি চালু করতে সময় লাগছে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে। অনেক কারখানা জেনারেটর ব্যবহার করলেও স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আড়াইহাজার জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার টি এম মেজবাহ উদ্দিন বলেন, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ চলায় আপাতত সরবরাহ কম রয়েছে। নাটোর, রাজবাড়ী, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। করাতকল, ওয়ার্কশপ, চালকল, অনলাইন সেবা ও কম্পিউটারভিত্তিক বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় ইজিবাইক ও অটোরিকশাচালকদের আয়ও কমে গেছে। বিদ্যুৎ সংকটে পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানকে দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে পর্যটকদের ভোগান্তিও বাড়ছে। বিরক্ত হয়ে কেউ কেউ বুকিং বাতিল করছেন বলে জানিয়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা। লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবাতেও তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীদের গরমের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীরাও বিদ্যুৎ সংকটে দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টের রোগীরা তীব্র গরমে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। চলমান এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মোমবাতি ও চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে। তাহিরপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসেন আহমদ তৌফিক বলেন, সন্ধ্যা হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে শিশুদের পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না। আড়াইহাজারের অটোরিকশাচালক মোহসিন মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায় না। এক বেলা গাড়ি চালানোর পর আরেক বেলা বসে থাকতে হয়। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। আড়াইহাজারে ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট। হরিণাকুণ্ডুতে ১২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৫ থেকে ৭ মেগাওয়াট এবং নাটোরের লালপুরে ২৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ১৪ মেগাওয়াট। নলছিটিতে ১৩ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট। অভয়নগরে ৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩০ থেকে ৩৩ মেগাওয়াট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯৯ মেগাওয়াট। বরগুনা, হাকিমপুর, সাটুরিয়া ও হোমনাতেও চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মুহাম্মদ সোহরাব আলী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে জেলার চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় লোডশেডিং করা ছাড়া আপাতত কোনো উপায় নেই। তীব্র গরমের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যোগ হওয়ায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সামনে পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র : অগ্রযাত্রা প্রতিদিন