|
পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং মাদক নির্মূলে বদ্ধপরিকর
বরিশালজুড়ে মাদকের ভয়াল থাবা, শতাধিক স্পটে ওপেনে বিক্রি
আহমেদ বায়েজিদ : বরিশাল মহানগরজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বিস্তার লাভ করেছে মাদক ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা ও গাঁজা এখন অনেক এলাকায় সহজলভ্য। দিনের পাশাপাশি রাতেও প্রকাশ্যে চলছে মাদক কেনাবেচা। ফলে কিশোর-তরুণ, যুবক, নারী এমনকি কিছু বয়স্ক ব্যক্তিও মরণনেশার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এর প্রভাবে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা, কিশোর অপরাধ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো নানা অপরাধও বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বরিশাল মহানগরজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা ও গাঁজা এখন অনেক এলাকাতেই সহজে পাওয়া যাচ্ছে। দিন-রাত কোনো ভেদাভেদ নেই—প্রকাশ্যেই চলছে কেনাবেচা। এতে কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে যুবক, নারী এমনকি কিছু বয়স্ক মানুষও এই মরণনেশার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। এর প্রভাবে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা, কিশোর অপরাধ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ঘটনাও বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বরিশাল মেট্রোপলিটন (বিএমপি) পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসের প্রথম ২৯ দিনে ৩ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ৪ কেজি ২৩০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধে আরও বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরিশাল মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অন্তত ১০০ টির বেশি স্থানে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ ওঠা এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাটার খাল বস্তি,চাঁদমারি বস্তি,রিফুজি কলোনি,৩০ গোডাউন খ্রিস্টান পাড়া, ধান গবেষণা রোড,শেরে বাংলা মেডিকেলের সামনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আবাসিক কোয়াটার এলাকার খালপার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে,বরিশাল কলেজ সংলগ্ন কালীবাড়ি রোড,ঝাউতলা গলি, কাউনিয়া সাবান ফ্যাক্টরি, ভাটিখানা ত্রে মাথা,মোরগ খালারপুল, বাগানবাড়ি,বিসিক হাউজিং পুরো এলাকা,বৈদ্যপাড়া,মুসলিম পাড়া,শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস,আমানতগঞ্জ টিভির মাঠ,বেলতলা,নাজিরের পোল,কাউনিয়া কালী মন্দিরের পাশে,জাইল্লা বাড়ির পোল,বিএম স্কুল ও শীতলা খোলা এলাকা, মুন্সি গ্যারেজ, গোরস্থান রোড,চাঁদমারি খেয়া ঘাট,লঞ্চঘাট এলাকা, ফিশারি রোড, কাশিপুর বাজার এলাকা,রাখাল বাবুর পুকুরপাড়,বটতলা এলাকার আশরাফ সড়ক,করিম কুঠির গলি,নিউ সার্কুলার রোড, ভিআইপি গেট এলাকা, পাবলিক হেলথ গলি, কালিজিরা ইটের ভাটা, নতুনহাট, বাঁশেরহাট খোলা, নবগ্রাম রোড, জিয়া সড়ক, রূপাতলী বটতলা, অ্যাপোলো হাসপাতাল গলি, নদীর পাড়, আমনতগঞ্জ, পলাশপুর, রসুলপুর বস্তি,মোহাম্মদপুর বস্তি, কেডিসি বস্তি, সাগরদী ধান গবেষণা সড়কের নদীপাড়, লালাদিঘির পাড়, দপদপিয়া সেতুর নিচে, গেস্টার বাইন,রূপাতলী হাউজিং, বসুন্ধরা হাউজিং, আহম্মেদিয়া মোল্লা সড়ক, নতুন বাজার, ত্রিশ গোডাউন, সাগরদী শেরেবাংলা সড়ক, দরগাবাড়ি, ব্রাঞ্চ রোড, কাউনিয়া কমিশনার গলি এলাকা সহ নগরীর প্রায় ওয়ার্ডে বিভিন্ন স্পটে ওপেনে মাদক বিক্রি চলছে দিন ও রাতে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় নিয়মিত মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা দেখা যায়। অনেক মাদকাসক্ত অর্থের যোগান দিতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত এক মাসে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া একাধিক চুরির ঘটনার পেছনেও মাদকাসক্তদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকায় নিয়মিত মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা দেখা যায়। অনেক মাদকাসক্ত টাকার জোগান দিতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত এক মাসে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া একাধিক চুরির ঘটনার পেছনেও মাদকাসক্তদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও গভীর। তাদের দাবি, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইয়াবা ও গাঁজার আসক্তি বাড়ছে। এতে শিক্ষাজীবন ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোও চরম সংকটে পড়ছে। সাগরদী এলাকার এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে আগে ভালো ছাত্র ছিল। এখন প্রায়ই টাকা চায়, চোখ লাল থাকে। পরে জানতে পারি সে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।” কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা বাদল হোসেন বলেন, “আমরা যেমন জানি কারা এই ব্যবসা চালায়, প্রশাসনও জানে। কিন্তু বড়দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ছোটখাটো বিক্রেতাদের ধরেই অভিযান দেখানো হয়।” নবগ্রাম রোডের ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার বলেন, “অভিযানের খবর অনেক সময় আগেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মূল নিয়ন্ত্রকদের ধরা যায় না।” স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার পেছনে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাদের দাবি, নিয়মিত অভিযান হলেও মাদকের সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়া এবং অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সচেতন মহলের অভিমত, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই মাদক নির্মূল হবে না। মাদক সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় না আনলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার স্থায়ী প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি এবং একই এলাকাকে ঘিরে অভিযোগ অব্যাহত থাকায় আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের অভিমত, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই মাদক নির্মূল হবে না। মাদক সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় না আনলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান চললেও মাঠপর্যায়ে তার স্থায়ী প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি এবং একই এলাকাকে ঘিরে অভিযোগ অব্যাহত থাকায় আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের সভাপতি অধ্যক্ষ (অব.) গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, “বরিশালে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইয়াবার বিস্তার। উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণদের বড় একটি অংশ এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। নারী শিক্ষার্থীরাও বাদ যাচ্ছে না। মাদকাসক্তির কারণে অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।” তিনি আরও বলেন, “মাদক ব্যবসার পেছনে গডফাদার রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।” এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “মাদকের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং মাদক নির্মূলে বদ্ধপরিকর। বড় বা ছোট—যে-ই মাদক ব্যবসায়ী হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বরিশালবাসীর প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের অভিযোগ, একই এলাকাকে ঘিরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ এবং ধারাবাহিক অভিযানের পরও কেন পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না? নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়—মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
Post Views: ০
|
|