|
ব্যতিক্রমী ‘উঠোন স্কুল’, খোলা আকাশই ছাদ আর মাটির উঠোনই পাঠশালা
বরিশালের ভাসমান মান্তা শিশুদের জীবনে ফিরছে শিক্ষার আলো
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বিকেল গড়ালেই বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে এক মায়াবী সুর প্রতিধ্বনিত হয়। সেটি কোনো নদীর কলতান নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে মাটির উঠোনে বসা একদল শিশুর কচি কণ্ঠের বর্ণমালা পাঠ। নদীর জলে যাদের জীবনের শুরু আর শেষ, সেই যাযাবর মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য শিক্ষার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন দুই বোন মুন্নি আক্তার ও মিতু আক্তার। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার লোহালিয়া গ্রাম। এখানে নদীর পাড়ে বসতি গড়েছে প্রায় অর্ধশত মান্তা পরিবার। স্থায়ী ঠিকানা বা জমিজমাহীন এই সম্প্রদায়ের শিশুরা যুগ যুগ ধরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই অন্ধকার ঘুচাতেই চার মাস আগে মুন্নি ও মিতু শুরু করেছেন এক ব্যতিক্রমী ‘উঠোন স্কুল’। যেখানে খোলা আকাশই ছাদ আর মাটির উঠোনই হলো পাঠশালা। নিজেদের সন্তানদের শিক্ষিত হতে দেখে মুন্নি ও মিতু অনুভব করেন, নদী তীরের এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরও সমান অধিকার রয়েছে। উদ্যোক্তা মুন্নি আক্তার বলেন, ওরা সারাদিন নদীতে থাকে, জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু অক্ষরজ্ঞান ছাড়া তো জীবন অন্ধ। তাই আমরা ঠিক করেছি, ওদের প্রাথমিক শিক্ষাটা আমরাই দেব। নিজেদের জমানো টাকা দিয়েই বই-খাতা কিনে দিচ্ছি। তাদের এই উদ্যোগে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন বাবা মো: আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, মেয়েরা যখন এই শিশুদের অক্ষর শেখানোর স্বপ্ন দেখল, আমি নিজেকে আর দূরে রাখতে পারিনি। সাধ্যমতো ওদের পাশে আছি।স্থানীয়দের কাছে এই দুই বোন এখন পরম শ্রদ্ধার পাত্র। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: জামাল হোসেন পুতুল বলেন, এনজিওর প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর এই শিশুরা আবার ঝরে পড়েছিল। মুন্নি ও মিতুর এই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সত্যিই বিরল। আমরা তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার চেষ্টা করব। মান্তা সম্প্রদায়ের এক আবেগাপ্লুত অভিভাবক বলেন, আমরা তো সারা জীবন নৌকায় কাটাইছি, নাম দস্তখত শিখতে পারি নাই। এখন পোলাপানগো হাতে কলম দেখলে বুকটা ভইরা যায়। সদিচ্ছা থাকলেও এই পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। খোলা আকাশের নিচে পড়াশোনা হওয়ায় বৃষ্টি বা তীব্র রোদে পাঠদান ব্যাহত হয়। একটি স্থায়ী টিনশেড ঘর বা পাঠাগারের অভাব এখনো এই স্বপ্নের পথে প্রধান অন্তরায়। মুন্নি আক্তার জানান, সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই মান্তা শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও সুসংহত করা সম্ভব হতো। বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমাউল হুসনা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এমন সাহসী ও মানবিক উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কীভাবে এই শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা যায়, তা নিয়ে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নেব। নদীর ঢেউয়ের মতোই চঞ্চল আর অনিশ্চিত মান্তা শিশুদের জীবন। সেই ভাসমান অস্তিত্বের মাঝে মুন্নি ও মিতুর এই ছোট্ট পাঠশালাটি এখন এক আলোর মশাল। নদীর তীরে বসে শিশুদের উচ্চস্বরে পড়া বর্ণমালার সেই প্রতিধ্বনি জানান দিচ্ছে—সুযোগ পেলে এই যাযাবর শিশুরাও বদলে দিতে পারে আগামীর ইতিহাস।
Post Views: ০
|
|