|
নেই ন্যূনতম শিক্ষার ছোঁয়া, তাদের মূল পেশাই হচ্ছে নদীতে ভেসে ভেসে মাছ ধরা
মান্তা সম্প্রদায় : সারাটা জীবন নৌকায় পার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী
শাওন খান, অতিথি প্রতিবেদক : জসিম সরদার। বরিশালের সদর উপজেলার লাহারহাট ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকার মান্তা সম্প্রদায়ের সরদার। জীবনের ৪৮টি বছর নৌকায় কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। নিজে কোনোভাবে জীবন পার করলেও ছেলেমেয়েদের নিয়ে রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। শুধু জসিম সরদার নয়, একটি স্কুলের অভাবে ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে পারছেন না লাহারহাট ফেরিঘাট সংলগ্ন মান্তা সম্প্রদায়ের দেড়শ পরিবার। এ দেড়শ পরিবারে আড়াইশো ছেলেমেয়েসহ অন্তত ৭৫০ জনের বসবাস। এদের কারোর মধ্যে নেই ন্যূনতম শিক্ষার ছোঁয়া। জন্মের পর থেকে একটু বড় হয়েই শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের পেশাকেই বেছে নিচ্ছে। আর তাদের মূল পেশাই হচ্ছে নদীতে ভেসে ভেসে মাছ ধরা।

শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মান্তা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা ৫-৬ বছর বয়স থেকেই তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে নেমে পড়ে নদীতে মাছ ধরতে। সেখানে থেকেই তারা ধীরে ধীরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়ে। এরপর আর শিক্ষার কোনো সুযোগ থাকে না তাদের। সদর উপজেলার লাহারহাট ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকার মান্তা সম্প্রদায়ের সরদার জসিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেই বয়সে মোগো পোলা-মাইয়ার হাতে বই-খাতা-কলম থাকার কথা, সেই বয়সে মোরা মাছ ধরার জাল তুইল্লা দেই। এছাড়া আর মোগো কোনো উপায় নাই। কারণ মোরা মাইয়া পোলা স্কুলে লেহাপড়া হড়াইতে (করাতে) পারি না। মোগো পোলা মাইয়া স্কুলে দেলে ওগো লগে কূলের (পাড়ের) পোলা মাইয়ারা পড়তে চায় না। মোগো পোলাপাইনগো কূলের গুড়াগাড়ায় (ছেলেমেয়েরা) চেতায় (উত্ত্যক্ত) যে তোরা মান্তার মাইয়া পোলা। এসব হোনার পর আর মোগো পোলাপাইন স্কুলে যাইতে চায় না। হেরপরও অনেক জোর হইররা বুঝাইয়া স্কুলে দেছেলাম, কিন্তু কূলের গুড়াগাড়ায় মোগো পোলাপাইন ধইররা মারে। হেইয়ার লইগ্গা আর পোলা মাইয়ারা স্কুলে যাইতে চায় না।’

তিনি বলেন, ‘হুদা গুড়াগাড়া স্কুল পাডানো লইয়া সমস্যা না। মোগো মধ্যে কেউ যদি মরে হেরে মাডি দেওয়া লইয়া মোগো বিপদে পড়তে হয়। কূলে কেউ মোগো একটু মাডি দেওয়ার জায়গাও দেতে চায় না। অনেক কষ্ট হইরা এর-ওর হাতে-পায়ে ধইররা মাডি দেওন লাগে। এর আগেতো কেউ মরলে কেলা গাছের (কলাগাছ) ভোর খিলাইয়া (ভেলা বানিয়ে) ভাসাইয়া দিতাম। এখন আর হে (তা) পারি না। ডাঙ্গায় মেম্বার-চেয়ারম্যানগো হাতে-পায়ে ধইররা মাডি দেই।’ জসিম সরদার বলেন, ‘অথচ দেহেন মোরা হগলডি (আমরা সবাই) কিন্তু এহানের ভোটার। ভোডের সময় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা আইয়া মোগো লগে মিডা মিডা কথা কয়। ভোডের পর আর কেউর খবর থাহে না। মোরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই যেন মোগো পোলা মাইয়াগো লইগ্গা একটা আলাদা স্কুল কইররা দেয়। এছাড়া মোরা মরলে যেন একটু কূলে মাডি (মাটি) পাই। হেই জন্য একটা গোরস্তানের দাবি জানাই। মোরা একটা স্বাভাবিক জীবন চাই।
একই কথা বলেন লাহারহাট ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকার মান্তা সম্প্রদায়ের সদস্যরা। সাত বছরের শিশু সুমাইয়া বলে, ‘লেহাপড়া করতে চাই কিন্তু এই এলাকার আশপাশে কোনো স্কুল নাই। তাই স্কুলে যাইতে পারি না। বাপ-মায় দূরের স্কুলে পাডাইতে (পাঠাতে) চায় না।’ আরেক শিশু সাব্বির (৯) বলে, ‘স্কুলে ভর্তি হইছেলাম কিন্তু মোগো লগে কেউ পড়তে চায় না। মোগো পাশে কেউ বইতে চায় না। আর স্কুলের বড় তায় মোগো ধইররা মারে, হেইয়ার লইগ্গা এহন আর স্কুলে যাই না। বাপে-মার লগে মাছ ধরি।’ লাহারহাট ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুরা সারাদিন খেলাধুলা ও এদিক সেদিক ঘুরেফিরে দিন পার করছে। কেউ কেউ নদীতে লাফিয়ে পড়ে গোসল করছে, আবার কেউ নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েছে মাছ ধরতে। এভাবেই চলছে তাদের শৈশবকাল। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাদিরা রহমান বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের সমস্যাগুলো মৌখিকভাবে শুনেছি কিন্তু আমার কাছে অফিসিয়ালি কেউ আসেনি। তারা অফিসিয়ালি আসলে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো।’
তিনি বলেন, ‘আমার নিজের ইউনিয়নেই কোনো পাবলিক কবরস্থান নেই। ইউনিয়ন পরিষদে এজন্য সরকারি বরাদ্দও নেই। তাই ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু করতে পারছি না। বরাদ্দ পেলে তাদের সবরকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।’ বরিশাল জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তাদের জন্য আলাদা কবরস্থানের সুযোগ নেই। কারণ এখন আর তেমন খাস জায়গা নেই। তবে অন্যান্য কবরস্থানে যেন মান্তা সম্প্রদায়ের লোকজনের দাফন দিতে পারে সেজন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা করা হবে। স্কুলেও যাতে মান্তা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা বৈষম্যের শিকার না হয় সেজন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
সূত্র : জাগো নিউজ
Post Views: ০
|
|