|
এ শিল্পকে ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে সার্কাস প্রদর্শনীর অনুমতি
বন্ধের পথে বরিশালের ঐতিহ্য লক্ষণ দাস সার্কাস
শাওন খান, অতিথি প্রতিবেদক : ঐতিহ্যে জড়ানো বরিশালের ‘দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাস’ এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। প্রদর্শনীর অনুমতি না পাওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সার্কাসে ব্যবহৃত উপকরণগুলো। একে একে খেলোয়াড়রা চলে যাচ্ছেন নিজ নিজ বাড়িতে। যারা রয়েছেন তাদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাসের পরিচালক অরুণ দাস। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সার্কাসের খেলোয়াড়, শিল্পী ও সহযোগীদের খাওয়ানো পড়ানোর খরচ পোষাতে জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানান পরিচালক। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার তীরঘেঁষে বয়ে যাওয়া গৌরনদী নদীতে বাঁধা ট্রলারে গিয়ে দেখা যায় তাদের মানবেতর জীবনযাপনের দৃশ্য। ট্রলার দুটি ঘুরে দেখা যায়, দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাসের পরিচালক অরুণ দাস ও তার কিছু খেলোয়াড় ট্রলার দুটিতেই বসবাস করছেন। বাকি সদস্যরা কোনো প্রদর্শনী না থাকায় একে একে বাড়ি চলে গেছেন। যারা রয়েছেন তারা কোনোরকম খেয়ে-পরে বেঁচে আছেন। সার্কাস দলটির খেলোয়াড় পূজা মণ্ডল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রদর্শনী নেই তাই শুয়ে বসে কোনোরকম দিন পার করছি। দাদু (পরিচালক) অনেক কষ্টে সবার খাবারের ব্যবস্থা করেন। শুনেছি এই সার্কাস চালিয়ে রাখতে নিজের জমিও বিক্রি করেছেন তিনি।’ অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করছেন না কেন জানতে চাইলে পূজা বলেন, ‘আড়াই বছর বয়স থেকে এখানে আছি। সেই সময় থেকেই এখানে বড় হয়েছি। তাই এই সবকিছুর প্রতি একটা মায়া হয়ে গেছে। তাছাড়া মা নেই। বাবা গাছ থেকে পড়ে কোমর ভেঙে বিছানাগত। তাদের অবর্তমানে দাদুর কাছেই বড় হয়েছি। তাই এখান থেকে তাদের ছেড়ে আর যাওয়া সম্ভব নয়।’ সিনিয়র খেলোয়াড় রুনা মণ্ডল বলেন, ‘সাত বছর ধরে এখানে আছি, এখন ২৭ হয়েছে। এখন এটাই আমার পরিবার। তবে এই পরিবারে আগে খুব ভালো দিন কাটলেও এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রদর্শনী নেই।’ তিনি বলেন, ‘কোথাও প্রদর্শনীর অনুমতি দিতে চায় না প্রশাসন। প্রদর্শনীর অনুমতি না পেয়ে বসে থেকে আমাদের সব উপকরণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারণ সার্কাসের বেশিরভাগ উপকার লোহার তৈরি। তাছাড়া আমাদের বিশাল একটি টিম। প্রদর্শনী না থাকলে এতগুলো মানুষ বসে বসে খাওয়া অনেক খরচের ব্যাপার। এখন কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি।’ একই কথা বলেন দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাসের অন্যান্য খেলোয়াড়রাও। তারা এ শিল্পকে ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সার্কাস প্রদর্শনীর অনুমতির দাবি জানান। দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাসের পরিচালক অরুণ দাস বলেন, ‘সেই করোনার শুরুতে ঘরে ফেরার পর থেকে বরিশালে এখন পর্যন্ত প্রদর্শনীর কোনো অনুমতি মেলেনি। দুই বছর ধরে বসে থাকায় অনেক উপকরণ নষ্ট হয়েছে। খেলোয়াড়রা বাড়িতে চলে গেছে। অথচ এ সার্কাস বরিশালের একটা ঐতিহ্য। প্রদর্শনীর অনুমতি না মেলায় এখন সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।’ ১৯৪৯ সালে গৌরনদীর লক্ষণ দাস দি রয়েল বেঙ্গল লক্ষণ দাস সার্কাস প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে চলে আসছে এই সার্কাস। এখানে ৮৫ জন কলাকুশলী ৪৫ ধরনের খেলা প্রদর্শন করেন। কিন্তু প্রদর্শনী না থাকায় একে একে সবাই বাড়ি চলে গেছেন। এখন দলের সঙ্গে রয়েছেন মাত্র ১১ জন। কাজ না থাকায় তারাও অলস সময় পার করছেন। একসময় এ অঞ্চলে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল লক্ষণ দাসের সার্কাস। তখন বছরে ২১৬ দিন পর্যন্ত সার্কাসের প্রদর্শনী হয়েছে। অরুণ দাস বলেন, ‘কোনো মাঠে প্রদর্শনীর অনুমতি মিললে সেখানে আয়োজকরা শুরু করে দেন যাত্রা, জুয়া, হাউজি ও লটারি। আর এসবের কারণে আমাদের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। অথচ এসব কিছুর সঙ্গে আমাদের প্রদর্শনীর কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও ভুক্তভোগী হই আমরা। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, সব কিছু বিবেচনা করে যেন এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সার্কাস প্রদর্শনীর অনুমতি দেওয়া হয়।’ এ বিষয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘তারা সার্কাসের নামে যাত্রা, জুয়া, হাউজি ও লটারি চালান। এজন্য এটা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নিয়মের মধ্যে থেকে অনুমতি চাইলে সার্কাস প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে।’
সূত্র : জাগো নিউজ
Post Views: ০
|
|