|
‘তারল্য সংকট’ দেখিয়ে বারবার অর্থ ফেরত না দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে
বরিশাল জেলা পরিষদের ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ফেরত দিচ্ছে না ন্যাশনাল ব্যাংক
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বরিশাল জেলা পরিষদের গচ্ছিত প্রায় ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা ফেরত দিচ্ছে না ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। দীর্ঘদিন ধরে ‘তারল্য সংকটের’ কথা বলে অর্থ আটকে রাখায় জেলা পরিষদের কর্মকর্তা—কর্মচারীদের বেতন—ভাতা, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। একাধিকবার লিখিতভাবে টাকা ফেরত চেয়েও সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বরিশাল জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির বরিশাল শাখায় দুটি সঞ্চয়ী হিসাবে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ জমা রাখে জেলা পরিষদ। এর মধ্যে একটি হিসাবে ৬ কোটি ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১১ টাকা এবং অপর হিসাবে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ৩৯৫ টাকা জমা থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। জেলা পরিষদের নথিতে দুটি হিসাবে মোট ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা পাওনা দেখানো হয়েছে। জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিল পরিশোধের প্রয়োজন হওয়ায় গত বছরের ৪ জুন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে গচ্ছিত সম্পূর্ণ অর্থ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বরিশাল জেলা পরিষদের নামে পে—অর্ডারের মাধ্যমে তিন কর্মদিবসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও টাকা ফেরত দেয়নি ব্যাংক। এরপর গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় ন্যাশনাল ব্যাংকের বরিশাল শাখায় চিঠি দেওয়া হয়। এবার দুটি পে—অর্ডারের মাধ্যমে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা সর্বোচ্চ পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়। জবাবে ন্যাশনাল ব্যাংক বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসা জেলা পরিষদকে জানান, বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, ব্যাংকের তারল্য সংকট এখনো কাটেনি। এ কারণে ওই মুহূর্তে পে—অর্ডার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলা পরিষদের অর্থ পরিশোধ করা হবে বলেও আশ্বস্ত করা হয়। তবে ওই আশ্বাসের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অর্থ ফেরত পায়নি জেলা পরিষদ। এদিকে ব্যাংকে জেলা পরিষদের অর্থ আটকে থাকার মধ্যেই একটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ১ লাখ টাকার চেক ইস্যু করা হয়। নলশ্রী, দিদিহার, নেছারিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ঈদগাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামের নামে ইস্যু করা ৪৬৪৫৩৭২ নম্বর চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলেও অর্থ পরিশোধ না করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসাকে আইনি নোটিশ পাঠান বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. আলী আহমেদ। তিনি বরিশাল জেলা পরিষদের নিয়োজিত লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে জেলা পরিষদের প্রশাসকের পক্ষে ওই নোটিশ পাঠান। নোটিশে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে জেলা পরিষদের গচ্ছিত সমুদয় অর্থ এক বা দুটি পে—অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর কথাও বলা হয়। তবে আইনি নোটিশের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা পরিষদ একটি টাকাও ফেরত পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে মঙ্গলবার বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ—সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসাকে জেলা পরিষদে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় তিনি ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ কবে নাগাদ ফেরত দেওয়া হবে, তা জানতে চান। তবে ব্যাংক ব্যবস্থাপক নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাতে পারেননি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, “জেলা পরিষদের মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে আটকে থাকবে—এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না। বারবার লিখিতভাবে টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে, আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। এরপরও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছে না।” তিনি বলেন, ‘তারল্য সংকট’ দেখিয়ে দিনের পর দিন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে রাখা হলে জেলা পরিষদের ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর দায়ভার জেলা পরিষদ বহন করবে কেন—এ প্রশ্নের জবাব ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।আকন কুদ্দুসুর রহমান আরও বলেন, “আজও ব্যাংক ব্যবস্থাপককে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে—জেলা পরিষদের টাকা কবে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলতে পারেননি। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বছরের পর বছর আটকে থাকবে, অথচ কবে ফেরত দেওয়া হবে তার কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না—এটা অত্যন্ত হতাশাজনক ও উদ্বেগের বিষয়।” তিনি জানান, জেলা পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা এবং গচ্ছিত সরকারি অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজন হলে আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই ব্যাংকে আটকে থাকা এবং ‘তারল্য সংকট’ দেখিয়ে বারবার অর্থ ফেরত না দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থ ফেরতের বিষয়ে ব্যাংকটির সক্ষমতা, বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি এবং জেলা পরিষদের অর্থ আটকে রাখার আইনগত ভিত্তি কী—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
Post Views: ০
|
|