Current Bangladesh Time
রবিবার নভেম্বর ৮, ২০২৬ ১:২৩ অপরাহ্ণ
Latest News
প্রচ্ছদ  » স্লাইডার নিউজ » ‘শ্মশান দীপালি’ : পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য আয়োজন 
Saturday November 7, 2026 , 8:17 pm
Print this E-mail this

সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হয়, আলোকসজ্জায় পুরো শ্মশানজুড়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ

‘শ্মশান দীপালি’ : পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য আয়োজন


মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য আয়োজন বরিশালের শ্মশান দীপালি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই আলোর উৎসব এখন শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে। ১৯২৭ সালে শুরু হওয়া এ আয়োজন সময়ের সঙ্গে বরিশালের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বরিশাল মহাশ্মশানে পালিত হবে শ্মশান দীপালি উৎসব। এ উপলক্ষে প্রদীপ, মোমবাতি ও আলোকসজ্জায় সাজানো হবে সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় ইতিহাসবিদ সাইফুল হাসান বুলবুল জানান, ১৭৯৭ সালে বরিশাল জেলা ঘোষণা করা হলেও নগর হিসেবে বরিশালের যাত্রা শুরু হয় ১৮০১ সালে। নগরের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই বরিশাল মহাশ্মশান গড়ে ওঠে। সে হিসাবে এর বয়স ২০০ বছর পেরিয়েছে। প্রথম দিকে নতুন বাজার এলাকায় এটি আদি শ্মশান নামে পরিচিত ছিল। পরে কাউনিয়া এলাকায় মহাশ্মশান গড়ে ওঠে। তবে মহাশ্মশান প্রতিষ্ঠার অনেক পরে শুরু হয় শ্মশান দীপালি। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস জানান, নগরের কাউনিয়া এলাকায় ৫ দশমিক ৯৬ একর জায়গায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য মহাশ্মশানটি গড়ে তোলা হয়েছে। এটি পরিচালনার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের হলেও স্থানীয়ভাবে বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি এর তত্ত্বাবধান করে। প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যায় দীপাবলি উপলক্ষে বরিশাল মহাশ্মশানে সমবেত হন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। দূরদূরান্ত থেকে স্বজনেরা আসেন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে। সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হয়। আলোকসজ্জায় পুরো শ্মশানজুড়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। পূর্বপুরুষদের স্মরণে অনেকে ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজান। পরিবেশন করা হয় ভক্তিমূলক সংগীত। কারও কাছে এটি পারিবারিক স্মৃতিচারণের আয়োজন, কারও কাছে শেকড়ের টানে ফিরে আসা। আবার অনেকের কাছে বহু বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের অংশ এই উৎসব। প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকেই এখানে আসতাম। পূর্বপুরুষদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই আয়োজন এখন উৎসবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দুদের মধ্যে আর কোথাও এমন আয়োজন হয় বলে আমার জানা নেই।’

ইতিহাসের স্মৃতিও বহন করছে মহাশ্মশান

বরিশাল মহাশ্মশান কেবল মৃতদেহ সৎকারের স্থান নয়, এ অঞ্চলের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিভাণ্ডার। এখানকার বিভিন্ন সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভে মিশে আছে বহু মানুষের জীবন, সংগ্রাম, সামাজিক অবদান ও ঐতিহাসিক স্মৃতি। প্রবীণ ব্যক্তিত্ব রাখাল চন্দ্র দে বলেন, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রদূত দেবেন্দ্রনাথ ঘোষের সমাধি এ মহাশ্মশানের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। বরিশাল মহিলা পরিষদের সভাপতি শাহ সাজেদা জানান, এখানে নারী আন্দোলনের অগ্রদূত মনোরমা বসুর সমাধিও রয়েছে। ‘মাসিমা’ নামে পরিচিত মনোরমা বসু নারীশিক্ষা, সামাজিক পরিবর্তন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। গবেষক ও লেখক আনিসুর রহমান খান স্বপন বলেন, মহাশ্মশানের সমাধিগুলো কেবল ব্যক্তিগত শোকের স্মারক নয়, বরিশালের অতীত জানারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতিটি পুরোনো সমাধির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোনো না কোনো পরিবার, ব্যক্তি কিংবা সময়ের ইতিহাস। দীপালি উৎসবের দিনে সেই ইতিহাস নতুন করে সামনে আসে। বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির উপদেষ্টা ললিত কুমার দাস বলেন, শ্মশান দীপালির ঐতিহ্য এখন বরিশালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বরিশালের বাইরে বানারীপাড়া ও পটুয়াখালীসহ পাঁচটি স্থানে এ ধরনের আয়োজন হচ্ছে। তার মতে, বরিশালের এই উৎসবের মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখন অন্য এলাকার মানুষকেও অনুপ্রাণিত করছে।

বিপ্লবীদের যোগাযোগের মাধ্যম

শ্মশান দীপালি উৎসবের সূচনা নিয়ে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন নবম সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন শচীন কর্মকার। তিনি জানান, তার এক কাকা ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ওই কাকার কাছ থেকেই তিনি শুনেছেন, বরিশালের স্বদেশি আন্দোলনের বিপ্লবীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতে বরিশাল মহাশ্মশানকে ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবীদের একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে তারা শ্মশান দীপালি উৎসবের আয়োজন শুরু করেছিলেন বলে তার কাকা জানিয়েছিলেন। শচীন কর্মকার বলেন, তার কাকা প্রায় ৬৬ বছর আগে তাকে এ কথা বলেছিলেন। বিপ্লবীদের ধরার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানান তার কাকা। বিশেষ করে বিপ্লবী দেবেন ঘোষ ও প্রাণ কুমার সেনকে ধরতে গেলে তারা পালিয়ে যান। শচীন কর্মকারের ভাষ্য, শ্মশান দীপালির সময় বহু মানুষের সমাগম হতো। সেই ভিড়ের মধ্যে বিপ্লবীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা সহজ হতো। এ উদ্দেশ্যেই উৎসবটি শুরু হয়েছিল বলে তার দাবি। এভাবেই বরিশালের শ্মশান দীপালি একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণে আলোর উৎসব, অন্যদিকে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠেছে। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে উৎসবটি এখন বরিশালের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি অংশ।




Archives

Image
নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে পরীমনিকে নোটিশ, অশ্লীলতা বন্ধের নির্দেশনা
Image
‘শ্মশান দীপালি’ : পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য আয়োজন
Image
বরিশালে বিএনপির সমাবেশে হাতাহাতি, যুবদলের সাবেক সদস্যকে পিটিয়ে আহত
Image
বরিশালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে বাল্কহেড-ড্রেজার জব্দ, ৪ জনকে জরিমানা
Image
বরিশালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আফরোজা নাসরীনের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‌্যালি