|
পিরোজপুরের সাবেক এমপি আউয়ালের স্ত্রী, লায়লা পারভীন’র জালিয়াতি ফাঁস!
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়ালের স্ত্রী লায়লা পারভীন পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা শহরে অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাছে বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন। এ বাড়ি ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে তিনি ১৭ হাজার ২৫০ টাকা পাচ্ছেন। লায়লা পারভীন পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। ভাড়া চুক্তির মেয়াদ ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। লায়লা পারভীনের স্বামী একে এম এ আউয়ালের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে এ তথ্য বের হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লায়লা পারভীন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিকে দেওয়া ভাড়া চুক্তিতে যে বাড়িটি দেখিয়েছেন সেটি নাজিরপুর শহরের হাসপাতাল সড়কে। এর মালিক পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা প্রয়াত আলহাজ শেখ আবুল বাশার। বাড়িটি ১৩ শতক জমির উপর নির্মিত। ৩ তলা ভবনের বাড়িতে ৬টি ইউনিট রয়েছে। আলহাজ শেখ আবুল বাশার বর্তমান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আ.লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিমের বড় ভাই। আর পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের কার্যক্রম যেখানে চলছে সেটি দোতলা টিনশেড বাড়ি। নাজিরপুর সদর থানার বিপরীতে বাড়িটির অবস্থান। বাড়িটি খাস খতিয়ানের উপর। প্রয়াত শেখ আবুল বাশারের ছোট ভাই ব্যবসায়ী নুরে আলম সিদ্দিকী শাহিন জানান, লায়লা ইরাদ অভিনব জালিয়াতি করে বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন। নাজিরপুর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আবুল হোসেন জানান, নাজিরপুরে পল্লী বিদ্যুৎ এর সাব জোনাল অফিসের কার্যক্রম যেখানে চলছে সে ভবনটি খাস জমির উপর নির্মিত। গত ১৮ নভেম্বর সোমবার থেকে পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ এবং পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়াল এর সম্পদ ও অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তারা। একই সাথে দুদক তার স্ত্রী লায়লা ইরাদ (লায়লা পারভীন) এবং ছেলে আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম ও মেয়ে বুশরা আউয়াল অন্তরার সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধান চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো: আলী আকবর পিরোজপুরে এসে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে কার্যক্রম শুরু করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, গত ১৮ নভেম্বর সোমবার থেকে দুদকের উপ-পরিচালক মো. আলী আকবরসহ দুদকের একটি টিম পিরোজপুরে অবস্থান করে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল, তার স্ত্রী লায়লা পারভীন ও সন্তানদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। তবে এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক আলী আকবর সংবাদকর্মীদের সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে জানা গেছে, এ কে এম এ আউয়ালের নির্বাচনী এলাকায় সরকারি অর্পিত সম্পত্তি, খাসজমি, হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি নামে বেনামে তার এবং পরিবারের সদস্যদের ক্রয় করা সম্পত্তিসহ স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি এবং সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, টিআর কাবিখাসহ সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ থেকে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অনুসন্ধান করছেন দুদক কর্মকর্তারা। জানা গেছে, ২০১৭ সালের জুন মাসে পিরোজপুর-১ আসনের তৎকালীন এমপি ও পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আউয়ালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ জমা হয় দুদকে। পরে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৯ মে এ কে এম এ আউয়ালকে ঢাকার সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল ও হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠান দুদকের উপ-পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) সৈয়দ আহমেদ। ওই নোটিশে তাকে দুদক প্রধান কার্যালয়ে ২৩ মে হাজির হতে বলা হয়। সূত্র জানায়, প্রথম দফায় হাজির না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় গত ১৯ জুন আবার আউয়ালকে নোটিশ পাঠিয়ে ২৭ জুন তাকে দুদক প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। দ্বিতীয় দফা নোটিশে দুদকে হাজির হন এ কে এম এ আউয়াল। আউয়ালের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রথমে নিয়োগ পান দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ আহমেদ। পরে তিনি অবসরে গেলে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান দুদকের উপ-পরিচালক মো: আলী আকবর। পরে গত ২৪ অক্টোবর পিরোজপুর উপকর কমিশনারের কার্যালয়ে (সার্কেল-৬) এ কে এম এ আউয়ালের হালনাগাদ আয়কর রিটার্নের তথ্য চেয়ে দুদক থেকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিটি পাঠান নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো: আলী আকবর। ১১ নভেম্বরের মধ্যে হালনাগাদ রিটার্নের তথ্য দুদকে পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি। একই দিনে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিবের কাছেও চিঠি পাঠায় দুদক। ওই চিঠিতে বলা হয়, সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল বিগত সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় নির্বাচনী হলফনামার সাথে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করেছেন। অনুসন্ধানের স্বার্থে ওই সম্পদ বিবরণীর সত্যায়িত ফটোকপি ৪ নভেম্বরের মধ্যে দুদকে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। দুদক জানায়, গত ২৪ অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের সম্পদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্য পাঠানোর জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দুদকের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানে নেমে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ পাওয়া গেছে তা হল, এ কে এম এ আউয়াল এবং তার স্ত্রী লায়লা পারভীন মেসার্স বুশরা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সুভাষ এন্টারপ্রাইজ নামে দু’টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পিরোজপুরে ঠিকাদারী ব্যবসা করতেন এবং ঠিকাদারী ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। পিরোজপুরে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ এবং দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে অর্থ বাণিজ্য করে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আউয়ালের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বাড়ি, জমি দখল, কার্গো জাহাজ দখল করে নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট মনোনীত প্রার্থী জাতীয়পার্টি (এরশাদ) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দারের নির্বাচনী প্রতিক নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন এ কে এম এ আউয়াল। প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ বাণিজ্যসহ নানা স্বেচ্ছাচারিতামূলক কাজ করতে শুরু করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় দফা নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারি ও হিন্দুদের সম্পত্তি, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ উঠে।
Post Views: ০
|
|