|
পছন্দের ক্লিনিকে পরীক্ষা না করানোয় রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর চাপের মুখে পড়তে হবে কেন-এমন প্রশ্ন উঠেছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পছন্দের ক্লিনিকে পরীক্ষা না করানোয় এক নারী রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, তার পরীক্ষার প্রতিবেদন না দেখেই ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রমজান আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) হাসপাতালের বহির্বিভাগে। ভুক্তভোগী নাজমা বেগম নগরীর কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোড এলাকার বাসিন্দা মো. সরুজ মল্লিকের স্ত্রী। তার অভিযোগ, মাথাব্যথার চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ পান তিনি। কিন্তু কম খরচে পরীক্ষা করানোর জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ায় চিকিৎসকের বিরূপ আচরণের শিকার হন। নাজমা বেগমের ভাষ্য, চিকিৎসা নিতে ওই দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের নিচতলায় ডা. রমজান আলীর কক্ষের সামনে অপেক্ষা শুরু করেন তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর চিকিৎসক তাকে দেখেন এবং কয়েকটি পরীক্ষা করাতে বলেন। এ সময় এক নারীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় বলে দাবি তার। তবে ওই ক্লিনিকে না গিয়ে ‘সাইন্স ল্যাব’ নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক কম খরচে পরীক্ষাগুলো করান নাজমা বেগম। এরপর প্রতিবেদন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে কেন সুপারিশ করা ক্লিনিকে পরীক্ষা করাননি, তা জানতে চাওয়া হয়। রোগীর অভিযোগ, এ নিয়ে তাকে বকাঝকা করা হয়। এমনকি পরীক্ষার প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়া হয়। এ সময় চিকিৎসকের আচরণের প্রতিবাদ জানালে তার সহযোগীরা জোর করে কক্ষ থেকে বের করে দেন বলেও অভিযোগ করেন নাজমা বেগম। চিকিৎসা নিতে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। নাজমা বেগমের দাবি, এর আগেও তিনি ওই চিকিৎসকের কাছ থেকে সেবা নিয়েছিলেন। সে সময়ও চিকিৎসকের সুপারিশ করা ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে হয়েছিল তাকে। এবার অন্য প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর পর চিকিৎসকের আচরণে পরিবর্তন দেখতে পান বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার আরও অভিযোগ, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে একাধিক নারীকে অবস্থান করতে দেখা যায়। রোগী দেখার পর তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর জন্য পাঠানো হয়। ওই ক্লিনিকে পরীক্ষা না করালে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি তার। এদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন রোগীও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের কেউ কেউ নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। রোগীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঘটনাস্থলে গেলে হাসপাতাল পরিচালকের অনুমতি ছাড়া চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশের কারণ জানতে চান ডা. রমজান আলী। একপর্যায়ে এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে উপস্থিত রোগীদের মধ্য থেকেও কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন। একপর্যায়ে ডা. রমজান আলী নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তবে অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়ার পেছনে কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল কি না, সে বিষয়টিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন এমন একাধিক সংবাদকর্মীর অভিযোগ, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের ঘিরে দালালদের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে সব ভুক্তভোগী অভিযোগ না করায় অনিয়মের অনেক ঘটনা অজানাই থেকে যায়। তাদের আরও অভিযোগ, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কথা বললে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের ভয়ভীতি দেখানো ও হয়রানি করা হয়। ফলে অনেকে প্রতিবাদ না করে পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হন। এসব অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে পূর্বেও অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর। তিনি বলেন, “অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রমজান আলীর বিরুদ্ধে আগেও কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পরিচালক আরও জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসপাতালের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা ও সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছেন। রোগীদের হয়রানি বন্ধে দালাল প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের যেন কোনো নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, রোগীর পরীক্ষার প্রতিবেদন মূল্যায়ন এবং হাসপাতালের ভেতরে দালালচক্রের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই প্রত্যাশা রোগীদের।
Post Views: ০
|
|