|
আত্ম পরিচয়ের খোঁজে সাংবাদিকরা!-জিয়া শাহীন
সাংবাদিক। চারটি অক্ষর। তবে এর ব্যাপকতা, আত্মপরিচয়, কার্যক্ষমতা অব্যক্ত। একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত দুনীর্তিমূক্ত সমাজ। তার দুনীর্তিমূক্ত সমাজ গঠনে সাংবাদিকতার ভূমিকা অনিস্বিকার্য। সাংবাদিকাতর কন্ঠ রোধ মানেই স্বৈরাচারের উত্থান। এ কারনেই একটি গনতান্ত্রিক সরকার যে কয়টি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেন, তার মধ্যে সাংবাদিকতা অন্যতম। বাংলাদেশে সৎ এবং সাহসী সাংবাদিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন ইত্তেফাকের তফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া। ‘সাংবাদিকতার জনক’ হিসাবে পরিচিত মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবুল মনসুর আহমেদ, নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত নূরজাহান বেগম, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সাংবাদিক, কবি, সন্তোষ গুপ্ত, প্রথিতযশা সাংবাদিক এবিএম মূসা অন্যতম। এরই ধারাবাহিকতায় নির্মল সেন, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, আবেদ খান, নাইমুর রহমানরা পথ দেখিয়েছেন। এখনও দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। বরিশালের সাংবাদিকতায় এখনও আমরা ইত্তেফাকের মাইনুল হোসেন, মিন্টু বসু বা গুরু হিসাবে খ্যাত ওয়াজেদ আলী খানকে অনুস্মরণ করার চেষ্টা করি। তাদের নির্লোভ খ্যাতি দেখে অনেকেই সাংবাদিকতার পথ বেছে নিয়েছেন। বরিশালে সাহসী সাংবাদিক শওকত হোসেন মিল্টন, তৌফিক মারুফরা ঢাকায়ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। তেমনি সমকালের পুলক চ্যাটার্জি, যুগান্তরের আক্তার ফারুক শাহিন কিংবা কালের কন্ঠের রফিকের লেখায় এখনও দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপর? প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি পাইপ লাইন থাকে। বরিশালেও তরুণ একঝাঁক সাংবাদিক উঠে আসছেন তাদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে। কিন্তু প্রশ্নের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যেভাবে তরুণরা উঠে আসছে তাদের পিছনে তার কয়েকগুন অপ সাংবাদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগর জুড়ে। নাম পরিচয় বিহীন অখ্যাত কিংবা সম্পুর্ন বানোয়াট মিডিয়ার নাম দিয়ে যেভাবে চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে তাতে ওপারে থেকে লজ্জা পাচ্ছেন এক সময়ে বরিশালের শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিকরা। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল, প্রশাসন, মিডিয়া হাউস বা সংবাদিক সংগঠনগুলো জানে কারা ‘প্রেস’ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছে, মাদক বিক্রি করছে। এসব কুচক্রিদের নজরে থাকে জমি জমা বিক্রি, পালিয়ে আসা জুটি, হোটেল দেহ ব্যবসা, পরকিয়া এসব। নিউজ লেখার জন্য নয়। স্রেফ চাদাবাজি এদের অন্যতম লক্ষ্য। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নামধারী এসব অখ্যাতরা এখন কারাগারে। কিন্তু বড় একটি অংশ এখনও প্রকাশ্যে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোন এ্যাকশনে যাচ্ছেন না নানা কারনে। একজন ট্রাফিক পুলিশ দুঃখভরা কন্ঠেই বললেন, প্রেস লেখা মটর সাইকেল ধরলেই পত্রিকায় নিউজ হয় চাঁদাবাজ ট্রাফিক নামে। ফলে ঝামেলা এড়াতে তারা প্রেস লেখা মটর সাইকেল ধরেন না। এ কারনেই সুযোগটা নিচ্ছেন রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, মেকানিক এমনকি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা। তাদের মটর সাইকেলে প্রেস লিখে অবলীলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নগরী। নাম সর্বচ্চ পত্রিকা বা অন লাইনের নাম লিখে কার্ড ছাপিয়ে এরা চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে। অখ্যাত বা কুখ্যাত ঐসব নাম নিয়ে ভিজিটিং কার্ড বুকে নিয়ে শহরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সে নামগুলো শুনলেও চমকে উঠতে হয়। ‘দৈনিক মঙ্গলগ্রহ’বা ‘দৈনিক চাঁদ’ বাদে মনে হয় সব নামই এখন পত্রিকা বা অনলাইনে রয়েছে। গতকাল এক সাংবাদিক ভাই ম্যাসেঞ্জারে পোষ্ট করল একটি ভিজিটিং কার্ড। সেখানে লেখা – journalist and news editor all news paper – অর্থাৎ সব পত্রিকার তিনি নিউজ এডিটর। এক স্কুল শিক্ষক গতকাল একটি ভিজিটিং কার্ড নিয়ে এলেন। সম্ভবত বিয়ের জন্য পাত্রের সন্ধানে। এ কার্ডটি দেখেও চমকে উঠতে হল। কার্ডে পাত্রের নাম লেখা। তার নিচে লেখা ‘বরিশাল প্রেসক্লাব’। বরিশাল প্রেসক্লাব ব্যবহার করে কোন সাংবাদিক কার্ড ছাপিয়েছেন এমন উদাহরণ নেই। তদুপরি প্রেসক্লাবের তালিকা খুঁজে দেখলাম, এমন নাম কোথাও নেই। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনও বললেন বিষয়টি লজ্জাস্কর। তিনি খুঁজে দেখবেন। এভাবে চললে সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দেয়া সত্যি লজ্জার। হ্যাঁ একথাই ঠিক। বরিশালের অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকরা এখন “সাংবাদিক’’ পরিচয় দিতে লজ্জা পান। একবার প্রস্তাব উঠেছিল বরিশালের প্রতিটি মিডিয়া হাউজে গিয়ে প্রশাসন সাংবাদিকদের একটি তালিকা করবেন। কিন্তু সে প্রস্তাব কেন ফাইল চাপা পড়ল তা রহস্যজনক। আর এ সুযোগটি নিচ্ছে অ বা কু সাংবাদিকরা। তাদের দাপটে নিজেদের পরিচয় লুকাচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকরা। আর এর কারণেই নগরীতে বিস্তার ঘটছে মাদক, দুনীতিসহ নানা অপরাধ। পুলিশ যেমন দায় এড়াচ্ছে, সাংবাদিকরাও মাথা নিচু করে চলছে। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, সাংবাদিক নাম শুনলেও অনেকে ঘৃণা সংযুক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সাংবাদিক শব্দটির আত্মপরিচয় মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
জিয়া শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন
Post Views: ০
|
|