|
পিরোজপুর কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান পদে কাজী রুহিয়া বেগম হাসি
মো : সজিব হোসেন ফরাজী : রাস্তায় বের হলেই সবাই যাকে সালাম দেয়, ছোট-বড় সকলের কাছেই তিনি আর কেউ নন, আমাদেরই – ‘হাসি আপা’। পুরো নাম : কাজী রুহিয়া বেগম হাসি। সংগ্রামী এই নারী পিরোজপুরে অবহেলিত নারীসমাজের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘দেশ দশ’ নামের সংগঠন। শহরে নারীদের পরিচালিত প্রথম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘শ্যামক’ তার হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠিত। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষা বিস্তারেও রয়েছে তার অবদান। আর্থ-সামাজিক, মানব উন্নয়ন সংগঠন ও স্কুল-কলেজে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে কর্মী ও শিক্ষার্থীদের বাংলা অভিধানসহ মূল্যবান বই উপহার দিয়ে থাকেন তিনি। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দেশ দশ’ একটি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠন। অবহেলিত নারী ও শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তাদান ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই সংগঠন মূল লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য। এখানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীকে কর্মজীবী করে গড়ে তোলা হয়। সেই সঙ্গে নারীকে আর্থিক সহয়তা দিয়ে স্বনির্ভর করে পরিবারের সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়া হয়। এ ছাড়া বহু বেকার লোকের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন রুহিয়া বেগম হাসি। স্কুল থেকে ঝরে পড়া অবহেলিত শিশুদের পাঠদানের লক্ষ্যে হাসি আপা গড়ে তোলেন অমিতা শিক্ষালয়। এ কাজে তিনি স্থানীয় কয়েকজন নারীর সহায়তা নিয়েছেন। ভাষার মাস বা স্বাধীনতার মাসে তিনি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে হাজির হয়ে জাতীয় দিবসগুলোর গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কার বিতরণ করেন। বিভিন্ন রোগাক্রান্ত, দুস্থ ব্যক্তিকে আর্থিক সহযোগিতাও করেন। চলতি বছর নবীন লেখিকা আফরোজা মুন্নি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তিনি তাকে কলকাতা নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেন। হাসি আপার জন্ম ১৯৫৪ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে নানা বাড়িতে। তার বাবা কাজী আব্দুল করীম, মা হালিমা খাতুন। বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী ও শিক্ষক। মা গৃহিণী হলেও নীরবে করে যাচ্ছেন সমাজসেবামূলক কাজ। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় হাসি আপা যখন চট্টগ্রামের কুসুম কুমারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তখন তার বাবা সেখানে একটি কলেজের শিক্ষক। হঠাৎই তাদের সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। বাবা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরিবারে আর উপার্জনকারী ব্যক্তি না থাকায় সন্তানদের নিয়ে মা চলে আসেন পূরনো বাসস্থল কাউখালী উপজেলার শিষ্যা গ্রামে। সেখানে একটি বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন হাসি। সংসারের বড় মেয়ে হওয়ায় তাকে লড়তে হয় নানা বৈরী পরিস্থিতির সঙ্গে। তখন যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। মাইলের পর মাইল হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। শিষ্যা মডেল প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় তৎকালীন যশোর বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। তখনকার দিনে তিনি মাসে ৫ টাকা এবং বছরে বৃত্তির ৬০ টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে কাউখালী মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু তত দিনে অনেকের নজর পড়েছে এই অসহায় পরিবার আর সদ্য বেড়ে ওঠা মেয়েটির ওপর। লোকজনের কানাকানি শুনে হাসিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াবস্থায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মেরিন প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত একই গ্রামের কাজী আব্দুল লতিফের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন মা। বিয়ের পর তিন বছর তার পড়াশোনা বন্ধ থাকে। পরে পিরোজপুরে মায়ের কাছে এসে পড়াশোনা শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিনে তার প্রথম সন্তানের জন্ম। তিনি ১৯৬৯ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বড় ছেলের চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকালে হাটহাজারী কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হাসি শৈশব থেকেই স্বাধীনচেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। সেই লক্ষ্যেই তৎকালীন পিরোজপুর মহাকুমার নেতা এনায়েত হোসেন খানের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন। পাকিস্তানে অবস্থানরত চাকরিজীবী আত্মীয়-স্বজনরা বার্তা দিয়েছিলেন নৌকার পক্ষে কাজ করতে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি নৌকার পক্ষে কাজ করতে শুরু করেন। তখন তিনি পিরোজপুর, বরিশাল অঞ্চলসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সান্নিধ্যে রাজনীতির সুযোগ পান। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানের সঙ্গেও ছিল কাউখালী উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হাসি আপার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এরই মধ্যে তার কোলজুড়ে আসে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। নানা প্রতিকূলতায়ও ছেলে-মেয়েদের তিনি মানুষের মতো মানুষ করেন। তারা দেশ-বিদেশে বড় বড় পদে কর্মরত। মহিলা পরিষদের সভাপতি মনিকা মণ্ডল বলেন, ‘লড়াকু এই নারী (হাসি) সত্য বলতে ও মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যেতে পিছপা হন না।’ মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সালমা জাহান বলেন, ‘হাসি আপা জীবনসংগ্রামে জয়ী একজন নারী। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।’ হাসি আপার ছোট বোন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শিরিন আক্তার বলেন, ‘তার (হাসি) সাহস, দৃঢ়তা দেখে মনে হয় তিনি আমার বড় ভাই। এখনো পারিবারিক যেকোনো সিদ্ধান্তে আমরা তাকেই প্রাধান্য দিই।’ সদ্য সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চলছে সংরক্ষিত আসনে মহিলা এমপি নির্বাচনের পালা। বিজয়ীদলগুলোর এমপির সংখ্যানুপাতে আওয়ামীলীগের কোটা অনুপাতে পিরোজপুর-২ (কাউখালী-ভান্ডারিয়া-জিয়ানগর) আসন থেকে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেন কাজী রুহিয়া বেগম হাসি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের গড়া রাজপথের পরীক্ষিত এ নেত্রী গত উপজেলা নির্বাচনে কাউখালী উপজেলা থেকে বিপুল ভোটে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এ নেত্রী পিরোজপুর জেলা আওয়ামীলীগের একমাত্র মহিলা সদস্য মিসেস হাসী ১৯৭৫ এরপর আওয়ামীলীগের সভানেত্রী মরহুম আইভী রহমানের সাথে ঢাকায় সক্রিয় দলীয় কর্মকান্ডে জড়িত হন। এ ছাড়াও তিনি পিরোজপুর অরুনোদয় সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। কাউখালী নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি সহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত আছেন। তাকে এ অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চান এলাকাবাসী। তার কাছে ধনী গরীব, হিন্দু-মুসলিম বা বৌদ্ধ-খৃষ্টানের কোন ভেদাভেদ নেই। সমভাবেই সব শ্রেণীর মানুষকে ভালবাসেন এই পরোপকারী মহিলা।
Post Views: ০
|
|