|
সরকারী টাকা আত্মসাতের সুযোগ নেই, অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে
বরিশাল ডিসি অফিসে ‘অদৃশ্য’ ১০ লাখ টাকা, প্রশ্নের মুখে মামুন-হাবিব সিন্ডিকেট!
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ৪৭টি শূন্য পদে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া ১০ লাখ টাকার হদিস মিলছে না। ২০২২ সালে আইনি জটিলতায় পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পরও সরকারি ওই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও অর্থটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, কী খাতে ব্যয় হয়েছে কিংবা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না-তার কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর গোপনীয় সহকারী (সিএ) মো. মামুন সিকদার এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা নাজির হাবিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পরও উত্তোলিত অর্থের কোনো হিসাব-নিকাশ প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের নথিপত্র নিয়েও দেখা দিয়েছে রহস্য। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে জেলা প্রশাসন কিংবা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউই ওই অর্থের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। ফলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ১০ লাখ টাকার প্রকৃত হিসাব কোথায়, কার কাছে এবং কীভাবে ব্যয় হলো এ প্রশ্নের জবাব এখন প্রশাসনের কাছেই খুঁজছেন সচেতন মহল।অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২১ সালে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়, বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় এবং সার্কিট হাউজে ৪৭টি শূন্য পদ পূরণের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। লিখিত পরীক্ষার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পরীক্ষার আগের দিন আদালতসংক্রান্ত জটিলতায় তা স্থগিত করা হয়। অথচ নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া ১০ লাখ টাকা এরই মধ্যে উত্তোলন করা হয়েছিল বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অর্থের বিষয়ে জানার জন্য বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সংশ্লিস্ট শাখায় যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা কোন তথ্য প্রদান করতে রাজি হয়নি।বরিশাল ডিসি অফিসের জেলা নাজির মোঃ আসাদুজ্জামান খানের কাছে টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, জেলা প্রশাসনের অধিনে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কোন অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় না। আমার এ ধরনের কোন তথ্য জানা নেই। ৪৭টি শূন্য পদে নিয়োগের বিপরীতে ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে প্রতিবেদক এমন তথ্য নিশ্চিত করলে তিনি তা অস্বীকার করে বরাদ্দের সকল কাগজপত্র তাকে (প্রতিবেদককে) দিতে বলেন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ডিএসবি শাখার উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজের কাছ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০২১ সালে ৪৭টি শূন্য পদে ঐ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যখন পত্রিকায় সার্কুলার দেয়া হয়েছিল তখন নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন ডিসি স্যার। অর্থ বরাদ্দও আসত তার অনুকূলে। তাই ঐ সময়ে কোন বরাদ্দ আসছিল কিনা, বা তা কিভাবে খরচ করা হয়েছে আমার জানা নেই। এ ধরনের কোন দালিলিক প্রমানও আমাদের অফিসে সংরক্ষিত নেই বলে দাবী করেন সে। তিনি যোগ করে আরও বলেন, বর্তমানে জেনারেল সাইডের নিয়োগ দিবেন বিভাগীয় কমিশনার স্যার। তা ছাড়া ঐ নিয়োগের মেয়াদ গত মাসের ১৯ মে পর্যন্ত ছিল। আমরা অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি। সূত্রে জানাগেছে, ২০২১ সালের ১০ জুন ০৫.০০.০০০০.১৬৬.১১.০৪৪.১৫.১৩০ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়, বরিশাল ও এর অধীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়সমূহে এবং বরিশাল সার্কিট হাউজে ৪৭টি শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রদত্ত ছাড়পত্রের প্রেক্ষিতে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখের ০৫.১০.০৬০০.১১১.১০.০১২.২১.১০৫৫ নম্বর স্মারকে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদনকারী প্রার্থীদের ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তারিখ লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়ে তৎকালীন সময়ে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মোঃ মুশফিকুর রহমান প্রার্থীদের ঠিকানায় প্রবেশপত্র পাঠান। কিন্তু আইনি জটিলতার কারনে লিখিত পরীক্ষা একদিন আগে স্থাগিত করা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে, জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত নিয়োগ খাতে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন ডিসি অফিসের সাবেক জেলা নাজির (২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে অবসরে গিয়েছে) হাবিবুর রহমান এবং তৎকালীন সময়ে ডিসি অফিসের সংস্থাপন শাখায় অফিস সহকারী (বর্তমানে ডিসি বাংলোর সিএ) মোঃ মামুন সিকদার। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবী করেছেন, বরাদ্দকৃত উক্ত ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের পর তা বর্তমানে ডিসি বাংলোর (সিএ) মোঃ মামুন সিকদার ও সাবেক জেলা নাজির হাবিবুর রহমান ভাগভাটোয়ারা করে আত্মসাত করেছে বলে দাবী করেন অসমর্থিত সূত্রটি। আসলেই উক্ত অর্থ আতœসাত করা হয়েছে কিনা তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হজ পালনে সৌদিতে অবস্থানকারী জেলা নাজির হাবিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ডিসি বাংলোর (সিএ) মোঃ মামুন সিকদারকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। অনুসন্ধান করে জানাগেছে, পূর্বের স্থাগিত থাকা ৪৭ শূন্য পদ সহ আরও ৩৬ শূন্য পদ যোগ করে মোট ৮৩টি শূন্যপদ পূরনে ফের ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পত্রিকায় নিয়োগ সার্কুলার প্রকাশ করেন সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ দেলোয়ার হোসেন। মোট ৮৩টি শূন্য পদ পূরনে চলতি বছরের ৫ মার্চ বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ০৫.১০.০৬০০.০০০.১১১.০১.০০১২.২৬-১৪৭ স্মারক নং চিঠির মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে নিয়োগ পরীক্ষা উপখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে আবেদনপত্র পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসনের আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও অডিট শাখার ০৫.০০.০০০০.০০০.১১৫.২০.০০৫৯.১৬.৪৩৪ স্মারক নম্বরে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস স্বাক্ষরিত বাজেট বরাদ্দপত্র-৩ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে নিয়োগ পরীক্ষা উপখাতে বরিশাল জেলা প্রশাসকের অনুকূলে অতিরিক্ত ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করেন। বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগীয় কমিশনারকে এই নিয়োগ কমিটির প্রধান করা হলেও মামুন ও হাবিব সিন্ডিকেটের বহু বিতর্ক ও সমালোচনার পরও তাদের প্রভাব এখনও অটুট রয়ে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, পূর্ববর্তী বরাদ্দ এবং আসন্ন নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, অতীতে কিছু চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে (সিএ) মোঃ মামুন সিকদার ও সাবেক জেলা নাজির হাবিবুর রহমানের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকায় তাদের চাকরি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। যদিও এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সূত্রমতে, অবসরপ্রাপ্ত জেলা নাজির হাবিবুর রহমান এখনও জেলা প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা- কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে তার একাধিকবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসা-যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে এবং তিনি নেজারত শাখার ভিতরে কম্পিউটার রুমে বসে কাজ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোঃ মামুন সিকদার চাকরি জীবনের শুরু থেকে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত রয়েছেন। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে একাধিকবার বিভিন্ন দপ্তরে উত্থাপিত হয়েছে বলে অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর চূড়ান্ত তদন্ত ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ থাকলেও সেসব তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি পুনরায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর সিএ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। তার দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলা প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক কর্মচারীর বদলি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, এসব বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, জেলার বিভিন্ন ভ‚মি অফিস ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে বদলি এবং পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে মামুনের বিরুদ্ধে। এদিকে ২০২২ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা একাধিক লিখিত অভিযোগে মোঃ মামুন সিকদার ও অবসরপ্রাপ্ত নাজির হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ সচিব নিয়োগ এবং ২০২২ সালের হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, লিখিত পরীক্ষার খাতা পরিবর্তন, মেধাতালিকায় প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারী শামীম হাওলাদার ও শাহ আলম হাওলাদার তাদের লিখিত অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান। পরবর্তীতে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগকারী শাহ আলম হাওলাদার তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ২ সেপ্টেম্বর বরিশাল জেলার ৮৫টি ইউনিয়ন পরিষদে হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে অনুষ্ঠিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগে বলা হয়, কিছু প্রার্থীর কাছ থেকে লিখিত পরীক্ষা, স্পিড টেস্ট ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ গ্রহণের পর বিভিন্ন স্থানে বসে পরীক্ষার খাতা ও উত্তরপত্রে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামুন-হাবিবুরের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে পরবর্তীতেও বিভিন্ন পদে মামুন-হাবিবুরের বিরুদ্ধে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি তদন্তের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা-১) দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, বরিশাল জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনে ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা অভিযোগ নং-৪২/২২-এ জনৈক সবুজ দাবি করেন, ২০১৯ ও ২০২০ সাল থেকে কর্মরত কয়েকজন ওমেদারকে বাদ দিয়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নতুন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, নিয়োগ-সংক্রান্ত অর্থ সংগ্রহে মামুন-হাবিবুর ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। একই অভিযোগে আরও বলা হয়, তৎকালীন জেলা প্রশাসকের আমলে কিছু চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, বরিশালের তৎকালীন পরিচালক উত্তম কুমার মন্ডল ২০২২ সালের ১৮ জুলাই স্বাক্ষরিত এক পত্রে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে মামুন-হাবিবের বিরুদ্ধে অভিযোগটি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ২০১৫ সালে বরিশাল সদরের টিয়াখালী এলাকার বাসিন্দা সোহেল নামের এক ব্যক্তি বিভাগীয় কমিশনার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করা অভিযোগে দাবি করেন, তাকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মামুন-হাবিবুর অর্থ গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে চাকরি বা অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। অভিযোগকারী এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, তার অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান হয়েছিল। একই সময়ে বরিশাল নগরীর রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেনও বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করা লিখিত অভিযোগে মো. মামুন সিকদারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। এদিকে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে, বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত অভিযোগ, তদন্ত এবং বিতর্কের পরও কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী বলেন, বর্তমান জেলা প্রশাসককে ভুল বুঝিয়ে ডিসি বাংলোর সিএ মোঃ মামুন সিকদার তার অনুসারীদের বিভিন্ন শাখায় ভালো ভালো পোস্টিং করিয়েছেন। একাধিক কর্মচারী জানান, বাবুগঞ্জ ইউএনও অফিসের কর্মচারী সংস্থাপন শাখায়ৃ প্রেষণে থাকা হিসাব সহকারী মিঠু রানি দাসকে গত ৪ মার্চ বরিশাল সদর ইউএনও অফিসে বদলি করা হলে তিনি সেখানে যোগদান করে অফিস করেন। কিন্তু কোরবানী ঈদের সপ্তাহ খানেক পূর্বে মিঠু রানি দাসকে ইউএনও অফিস থেকে মৌখিকভাবে এনে ডিসি অফিসের নেজারত শাখায় কাজ করানো হচ্ছে। অপরদিকে রেকর্ড রুমের অফিস সহকারী ফারজানার ঘুষ গ্রহনের ভিডিও ভাইরালের পর তাকে শাস্তিমূলক বরিশাল সদর ইউএনও অফিসে বদলি করা হয়। তাকেও মৌখিকভাবে এলএ শাখায় নিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। জানাগেছে, মামুন সিন্ডিকেটের সদস্য এসএ শাখার নাজির আবুল খায়ের সিকদারের ভাতিজি ফারজানা। বিতর্কিত এই দুই নারী কর্মচারীকে বদলি করে ফের মৌখিকভাবে তাদেরকে জেলা প্রশাসনে নিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালন করানোর কারনে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমনকে ভুল বুঝিয়ে সিএ মামুন ও জেলা নাজির আসাদ্দুজামান তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে এ দুই নারীকে দিয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ করাচ্ছে। এদিকে সরজমিন পরিদর্শনে জানাগেছে, বরিশাল সদর উপজেলার ১নং রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ মোঃ শাকিল সিকদার কয়েক বছর ধরে ডিসি অফিসের সংস্থাপন শাখায় কম্পিউটারে টাইপিং সহ অফিসের অন্যান কাজ করে যাচ্ছেন। অথচো তার মূল কর্মস্থলে তিনি দায়িত্ব পালন না করেও পরিষদ থেকে নিয়মিত বেতন ভাতা নিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাম পুলিশের সরকারী চাকরি করে অবৈধভাবে তাকে ডিসি অফিসের সংস্থাপন শাখায় নিয়মিত বিভিন্ন কাজ করাচ্ছেন ডিসি বাংলোর সিএ মামুন সিকদার। গতকাল সরজমিন পরিদর্শনে রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের দফাদার ওমর ফারুকের কাছে শাকিল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিসি স্যার চেয়ারম্যান সাহেবকে বলছে, চেয়ারম্যান সাব শাকিল খুব ভালো কম্পিউটার জানে, আমি যদি ওকে মাঝে মাঝে ডিসি অফিসে ডেকে কাজ করাই কোন সমস্যা আছে? তখন চেয়ারম্যান সাব বলেছে না স্যার সমস্যা নেই, আপনার জখন দরকার হবে ডাকবেন। তাই শাকিল কয়েক বছর ধরেই ডিসি অফিসে কম্পিউটারে কাজ করেন, তবে তাকে পরিষদের কাজে ডাকলে আসে। এবিষয়ে সাবেক জেলা নাজির হাবিবুর রহমান হজ পালনে সৌদি আরবে অবস্থান করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। মোঃ মামুন সিকদারের ব্যবহৃত ০১৭১৩৪….৫৯ নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি। বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের ০১৭০৫-৪…০১ সরকারী নম্বরে কল দেয়া হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, সরকারী টাকা আত্মসাতের সুযোগ নেই। এমনটা হয়ে থাকলে অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে।
সূত্র : ক্রাইম নিউজ
Post Views: ০
|
|