|
সকল বাম পচে না…!-আলম রায়হান
আলম রায়হান : তিমির দত্ত, তিমির দা এখন অজানা স্থানে আছেন। অথবা এখনো অজানা গন্তব্যের যাত্রী হিসেবেই ছুটে চলছেন। আমরা অনেকে ভুলেগেছি তাকে, মনে রেখেছি কেউ কেউ। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন সফল ছাত্র নেতা। এবং রাজনীতির ‘বিপথের’ যাত্রী। এক পর্যায়ে অনিবার্য হতাশায় নিরূপায় হয়ে সাংবাদিকতায় আশ্রয় গ্রহন করেছিলেন। অতপর অসময়ে অজানা গন্তব্যে যাত্রা তাঁর। তাও তিন বছর হয়ে গেছে। দিনটি ছিলো ২৩ অক্টোবর। রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় সতীর্থ ছিলাম তিমি দার। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাকে, রাজনীতির কর্মী হিসেবে বরিশালে এবং সাংবাদিক হিসেবে ঢাকায়। দুই ভূবনে বিপরিত উচ্চতায় দেখেছি তিমি দাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার কারণে আমি বরিশাল ছাড়ি ১৯৭৮। এরপরও ঢাকায় আমার রাজনীতির দিকে খেয়াল রাখতেন তিমি দা, বরিশালে থেকে। সাবেক কর্মীর প্রতি এতোটাই মমতা ছিলো তার! ছাত্র লীগের বিশাল ভাঙ্গনের সময় আমি যুক্ত ছিলাম মান্না-আক্তার গ্রুপে। এ খবরে বরিশাল থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন তিমির দত্ত। লঞ্চ থেকে নেমে সোজা আসলেন মহসীন হলে আমার রুমে। ঘুম থেকে তুলে প্রথমেই বললেন, “তোমার মাথা খারাপ! মান্না জাসদ রাজনীতি করে না। তার পিছনে অন্য খেলা আছে। তোমাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।” নেতার আদেশ। না করার উপায় ছিলো না। এরপরও একটানা তিনদিন তিমিদা আমাকে তার সঙ্গে রেখেছেন। যাতে আবার ‘পিছলা’ না খাই। ১৯৮০ সালে সাপ্তাহিক জনকথায় কাজ করার সুবাদে বেশ পরে জেনেছি, তিমির দার কথাই ঠিক। মাহমুদুর রহমান মান্না আসলে জাসদ রাজনীতির লোক ছিলেন না। জাসদে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন কৌশলগত কারণে। তিনি ছিলেন ভিন্ন মেরুর। যে মেরুতে তখন শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন আমেনা বেগম। যে আমেনা বেগম এক সময় করারুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য জনমত সৃষ্টিতে দেশের প্রতিটি এলাকায় উল্কার মতো ছুটেছেন। অথচ এই আমেনা বেগমই হয়েগিয়েছিলেন ১৫ আগস্টের খুনী ফারুক-রশিদের মুখপাত্র। ডাকসুর কেরিসমেটিক ভিপি-জিএস হিসেবে মান্না-আক্তারের প্রতি অনেকের মতোই আমার প্রবল আকর্ষন ছিলো। উল্লেখ্য, ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কৃত হবার পর তাদের ‘ছাত্র প্রিয়তা’ মোটেই কমেনি তখন। আর মাহমুদুর রহমান মান্ন অন্য উচ্চতার ছাত্র নেতা হিসেবে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। ফলে তার প্রতি অনেকেরই আকর্ষন ছিলো। এমন কি, তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন সেই সময় অনেকের ঘুম হরণকারী নায়িকা ববিতাও। ববিতার আরো অনেক কেচ্ছাকাহিনী আছে। তার জন্য যারা দেওয়ানা হয়েছেন তাদের মধ্যে একজন, পরে মন্ত্রী হয়েছেন, এখন বিএনপির ক্লিন ইমেজের শীর্ষস্থানীয় নেতা। তার বাবাও মন্ত্রী ছিলেন পাকিস্তান আমলে। তার বাবার নামে রাজধানীর একটি এলাকা বেশ পরিচিত। ডাকসুর ভিপি হিসেবে মাহমুদুর রহমান মান্নার হিমালয়সম উচ্চতার আকর্ষণ উপেক্ষা করে মুনির-হাসিব গ্রুপে যোগ দিয়েছিলোম। কারণ নেতার আদেশ উপেক্ষা করার মনোবল ছিলো না। ধরেই নিয়েছিলাম, আমার রাজনীতির যতটুকু অর্জন তার সবটুকুুই তিমি দার সৃষ্টি। আর শ্রষ্টার প্রতি অনুগত থাকা আমার ইনবিল্ড প্রবনতা। ফলে মান্না-আকতার গ্রুপ ছেড়ে আমাকে মনির-হাসিব গ্রুপেই যেতে হলো। যদিও শেষতক রাজনীতিতে বেশি দিন আর থাকা হয়নি আমার। যেমন অনেকেই থাকেননি। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শফি আহমেদের মতো রাজনীতিতে এখনো কেউ কেউ টিকে আছেন। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। আবার অনেকেই নেই বাম রাজনীতির ধারায়। অনেকে ভিন্ন ধারায় বিলীন হয়েছেন। কেউ আবার ‘ডিমপচা’ পচেছেন! ক্যাসিনোকান্ড এবং বিশেষ এক উত্তির কারণে রাশেদ খান মেনন সম্প্রতি অন্য রকম আলোচনায় এসেছেন। এর ফলে একটি প্রবচন আবার আলোচনায় এসেছে, ‘বাম রাজনীতিক পচলে আর ব্যবহার উপযোগী থাকে না। পচা ডিম যেমন।’ কিন্তু সকল বাম রাজনীতিক পচে না, এর অনেক উদাহরন আছে। কিন্তু তারা আলোচিত হন না। যেমন তিমির দত্ত, শ্রদ্ধেয় তিমি দা। তিমির দত্তকে জানি ১৯৭৪ সাল থেকে। জাসদ ছাত্র লীগের বরিশাল জেলা প্রচার সম্পাদক ছিলাম। তিনি ছিলেন আমার সবেচেয়ে পছন্দের নেতা। সে সময় বরিশার ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে আরো ছিলেন ফরিদ ভাই, মাহবুব ভাই, জিন্না ভাই, সাইফুল ভাই প্রমুখ। এরা এখন সকলেই রাজনীতির বাইরে। আর বরিশালের সিরাজুল আলম খান হিসেবে পরিচিত পান্না ভাই, জেড আই খান পান্ন। তিনিও এখন রাজনীতিতে নেই। পেশায় আইনজীবি। তিমির দত্তও রাজনীতির বাইরে গিয়ে সাংবাদিকতায় ‘আশ্রয়’ নিয়েছিলেন। এটি ছিলো তার জন্য এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। রাজনীতিতে থাকাকালে তিমির দত্ত ছিলেন প্রায় ২৪ ঘন্টা সক্রিয়। এমনকি সামরিক শাসনের নিষেধাজ্ঞাও তার গতিকে শ্লথ করতে পারেনি। রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর তিনি ছুটেছেন, বলতে গেলে বাতাসের গতিতে। রাজনীতিই ছিলো তার শক্তি। যে শক্তি দিয়ে তিনি মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। এমনকি তার রাজনৈতিক শক্তিকে সমিহ করতেন সেই সময় ‘ভিন্ন শক্তির’ প্রতীক মজিবর রহমান সরোয়ারও। রাজনীতির একটি ধারার লেগে থাকার নেতা মজিবর রহমান সরোয়ার বহু আগে বরিশালে শক্তিশালী জনভিত্তির অর্জন করেছেন। বরিশালে নেতা হিসেবে তার উচ্চতাকে বিএনপির কেন্দ্রীয় পদও স্পর্ষ করতে পারেনি হয়তো। এদিকে বরিশালের হয়তো অজানা হতাশায় তিমির দত্ত রাজনীতি ছেড়েছিলেন। তিনি কি হতাশা নিয়েই ইহলোক ছেড়েছেন? আরো অনেক দিন ইহধামে থাকলে তিমির দত্ত এক পর্যায়ে রাশেদ খান মেননের মতো উল্টো ধারার আলোচনায় আসতেন কিনা, জানি না। তবে নিশ্চিতভাবে জানি, বামধারার শুদ্ধতা নিয়েই তিনি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কাটিয়েছেন। এমন অনেক বাম রাজনীতিক বাংলাদেশে আছেন। যারা আদর্শের কথা প্রচার করে যাচ্ছেন, নিরন্তর। কিন্তু তারা আলোচিত হন না। আসলে এটি বাম রাজনীতির এক ধরনের ‘কপালের লিখন’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। অথবা নানান কৌশলে এখানে ঠেলে দেয়া হয়েছে। অথচ রাজনীতি ও সমাজে বামদের অবদান অসাধারণ। কিন্তু এই অবদান পরিমাপ করা হয় না। যেমন পরিমাপ করা হয় না আমাদের সমাজে ঘরকন্যার কাজে নারীদের অবদানের বিষয়টি। সর্বশেষ বলি, ভালো থাকবেন তিমি দা, যেখানেই থাকেন। তবে জানি না, আমার এই কামনার কোন গুরুত্ব আছে কিনা!
Post Views: ০
|
|