দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র এই বেতার কেন্দ্রটি স্থাপনের উদ্দেশ্য ইতিমধ্যে ম্লান হয়ে গেছে
বেহাল দশা বরিশাল বেতারের : একমাত্র রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রটিই আজ অবহেলিত
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশ বেতার বরিশালের এখন যবনিকা কম্পমান। ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন মিডিয়াম ওয়েভের পাশাপাশি ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এফএম ট্রান্সমিটার সম্পন্ন এই বেতার কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন দুটি অধিবেশনে ১৪.২৫ ঘণ্টা অনুষ্ঠান প্রচারিত হলেও তা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এমনকি কেন্দ্রটির এফএম প্রচার তরঙ্গের অনুষ্ঠান এখন বরিশাল মহানগরী দূরের কথা, এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। আর মিডিয়াম ওয়েভের সিগন্যাল কেন্দ্রটির ১০-১৫ কিলোমিটারের বাইরে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র এই বেতার কেন্দ্রটি স্থাপনের উদ্দেশ্য ইতিমধ্যে ম্লান হয়ে গেছে। অথচ দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণ উপকূলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের আগাম সতর্কবার্তা সহ জানমালের নিরাপত্তা বিধানেই এই বেতার কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো ট্রান্সমিটার ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা ও অবহেলায় বাংলাদেশ বেতারের বরিশাল কেন্দ্রটি নিজেই এখন ধুঁকছে। অতি সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বরিশাল বেতার কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে স্থানীয় সুধী সমাজও এই বেতার কেন্দ্রটির আধুনিকায়ন সহ মানোন্নয়নের আবেদন জানান। সুধী সমাজের পক্ষ থেকে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বেতার কেন্দ্রটিতে ১০০ কিলোওয়াটের মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার স্থাপনের দাবির প্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী এর উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা দাখিলেরও নির্দেশ দেন। তিনি দক্ষিণাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তায় এই বেতার কেন্দ্রটির গুরুত্ব উল্লেখ করে তার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব কিছু করা হবে বলেও গণমাধ্যমকে জানান। কিন্তু মন্ত্রীর পরিদর্শনের পরপরই বরিশাল বেতার কেন্দ্রটির পরিচালক ও আঞ্চলিক প্রকৌশলীকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো এই স্টেশনে বদলি হয়ে এসেছেন রাজশাহী বেতারের পরিচালক। ফলে মন্ত্রীর দিক নির্দেশনাগুলো কে বাস্তবায়ন করবেন তা সবার কাছেই অজ্ঞাত হয়ে পড়েছে। উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ বিশাল জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ-দুর্বিপাক সহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আগাম সতর্ক করে দেওয়ার লক্ষ্যেই ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বরিশালে একটি ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন রেডিও স্টেশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে তখন বরিশাল শহরের পশ্চিম প্রান্তে রূপাতলী এলাকায় ২৫ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়। তবে এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়া ঘাতকের বুলেটে শহীদ হলে পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৮২ সালে সেনানাায়ক এরশাদ ক্ষমতা দখলের পরে প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৯১ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গ্রহণ সহ বরিশাল সদর আসন থেকে নির্বাচিত এমপি আব্দুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিষয়টি তাঁর গোচরে আনেন উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার। প্রেসিডেন্ট বিশ্বাসের নির্দেশে তৎকালীন তথ্য সচিব নূর উদ্দিন আল মাসুদ এ লক্ষ্যে ডিপিপি প্রস্তুত সহ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ তদারকি করেন। ১৯৯২ এর জুনের মধ্যেই ১৮ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ ডিপিপি-টি পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করা হলে ১৯৯২-৯৩ অর্থ বছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত সহ তা একনেকের অনুমোদনও লাভ করে। এই লক্ষ্যে বরিশাল মহানগরীর রূপাতলীতে প্রায় ১৮.৭৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই, ১৯৯৬-এর ৩০ জুন বাংলাদেশ বেতার বরিশাল কেন্দ্রটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। তবে তৎকালীন জোট সরকার এই উন্নয়ন প্রকল্পটির কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেনি। বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার বিষয়টি একাধিকবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পরেও টানা ৩ বছর ফেলে রেখে ১৯৯৯ সালের ১২ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিশাল বেতার কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ততদিনে এর ট্রান্সমিটারের আয়ুষ্কাল অর্ধেক ফুরিয়েছে। এরপর থেকে মেরামত আর জোড়াতালি দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র রাষ্ট্রীয় এই বেতার কেন্দ্রটি কোনোমতে চালু রাখা হলেও তা চলছে না চলার মতোই। গত সপ্তাহেই বরিশাল বেতারের এফএম ট্রান্সমিটারটি ৩ দিন বন্ধ থাকার পরে কোনোমতে চালু করা সম্ভব হলেও ১০ কিলোওয়াটের এফএম তরঙ্গের সিগন্যাল এখন ১-২ কিলোওয়াটে সীমাবদ্ধ। ফলে বেতার কেন্দ্রটির ১ কিলোমিটারের পরে বরিশাল বেতারের এফএম তরঙ্গের কোনো অনুষ্ঠান শোনা যাচ্ছে না। এসব বিষয়ে বরিশাল বেতার কেন্দ্রটির সদ্য বিদায়ী আঞ্চলিক প্রকৌশলী জানান, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি শ্রোতাদের কাছে এই বেতারের সিগন্যাল পৌঁছে দিতে। কেন্দ্রটির ট্রান্সমিটার দীর্ঘদিনের পুরোনো বলে স্বীকার করে চলতি বছরের মধ্যেই এফএম তরঙ্গের ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি ট্রান্সমিটার স্থাপনের লক্ষ্যে আগামী ৩ মে দরপত্র গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটারটির পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন বা নতুন স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।