|
জনতার আন্দোলন কিভাবে রাষ্ট্র ও সরকারকে সঠিক পথ দেখাতে পারে নুসরাত হত্যা মামলা তার বড় উদাহরণ
ফেনী জেলার সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ১ বছর
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে স্মরণকালের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেনী জেলার সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। গত বছরের ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন নুসরাতের মা শিরিন আখতার। ওইদিনই অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার অনুগত কিছু সাবেক ও বর্তমান ছাত্র জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। তারা ৩ এপ্রিল সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে খুনিরা পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা চালায়। ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্থর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হলে সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। চারদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত। এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটিতে ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ শেষে গত বছরের ২৪ অক্টোবর ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করে আদালত। মামলাটি বর্তমানে আপিল নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতে রয়েছে।

হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন :- অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

এছাড়া নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার তদন্তে গাফিলতি ও নুসরাতের বক্তব্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় চাকরিচ্যুত ওসিকে ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। তবে ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও নুসরাতের পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। শেষ হয়নি অপেক্ষার প্রহর, তারা চেয়ে আছে কবে দেখবে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর।নুসরাতের মা বলেন, এক বছর হয়ে গেলেও এখনো দু’চোখ এক করলেই ভেসে ওঠে মেয়ের মুখখানি। ‘আমরা উচ্চ আদালতের দিকে চেয়ে আছি, আশা করছি উচ্চ আদালতও আসামিদের ফাঁসির রায় বহাল রাখবে। আমরা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে সে দাবি জানাচ্ছি।নুসরাতের ছোট ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায় বিচার পেয়েছি। উচ্চ আদালতেও আমরা ন্যায় বিচার প্রত্যাশী। নোমান বলেন, আসামিদের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দৃষ্টান্তস্থাপন হবে। আর কোনো ভাইয়ের-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয় সেজন্য আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। মামলা প্রসঙ্গে বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু জানান, আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার পর খুব দ্রুত সময়ে পেপারবুক তৈরি হয়েছে। আশা করছি, করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ ও সাধারণ ছুটি শেষ হলে হাইকোর্টের আপিল বিভাগের শুনানির কাজও শুরু হয়ে যাবে। দ্রুত সময়ে আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং সব আসামির ফাঁসি কার্যকর হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই আইনজীবী। যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের আহ্বায়ক শিবলী হাসান মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে বিচার আদায়ের ক্ষেত্রে নুসরাত হত্যা মামলার রায় আমাদের এক নতুন দিনের পথ দেখিয়েছে। জনতার আন্দোলন কিভাবে রাষ্ট্র ও সরকারকে সঠিক পথ দেখাতে পারে নুসরাত হত্যা মামলা তার বড় উদাহরণ। জনতার দাবির মুখে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের রায় হলেও আমরা চূড়ান্ত রায় ও তার কার্যকরের প্রত্যাশায় আছি। তিনি বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার বিচার বাংলাদেশের আইন, শাসন ও বিচারবিভাগের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
Post Views: ০
|
|