প্রচ্ছদ » স্লাইডার নিউজ » বরগুনায় নিহত রিফাতের আসল খুনি বা খুনের আসল পরিকল্পনাকারী কে!
Friday June 28, 2019 , 8:30 pm
বরগুনায় নিহত রিফাতের আসল খুনি বা খুনের আসল পরিকল্পনাকারী কে!
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : প্রকাশ্যে স্বামীকে খুন হতে দেখলেন স্ত্রী। শতচেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলেন না খুনির ধারালো অস্ত্রের কোপ থেকে। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখে হতবাক দেশবাসী। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের এই ঘটনা ইতিমধ্যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়েছে। নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে-দেশটা কি মগের মুল্লুক? দিন-দুপুরে এভাবে খুন সিনেমার নৃশংসতাকেও হার মানায়। শত শত লোকের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার স্বামী শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফের (২৫) শরীরে আটটি কোপের চিহ্ন পেয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে ঘাড়ের রগ ও শরীরে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। মামলা হয়েছে ১২ জনের নামে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে এ মামলা করেন। পুলিশের সঙ্গে অভিযানে সহোযোগীতা করছে র্যাব সদস্যরাও। এমন যখন অবস্থা তার মধ্যেই সামনে আসল এক ফেসবুক পোস্টের কমেন্টের স্ত্রীনশট। যা সম্প্রতি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। যা থেকে আসলে অনেক কিছুই প্রকাশ পায়! এদিকে ওই স্ত্রীনশটে দেখা যায়, কমেন্টে নয়ন বন্ডকে ‘সরি জান’ বলে সম্বোধন করে মিন্নি শরীফ। এরপর প্রতিউত্তরে নয়ন বন্ড মিন্নিকে বলেন, ‘নো সরি… এগুলো আমার প্রাপ্য…।’ এরপর আবারো মিন্নি বলেন, ‘(নয়ন বন্ড) সরি বললাম তো…।’ তাদের এ উভয়ের এ ধরণের যোগাযোগ থেকে তাদের সম্পর্ক অনেকটাই স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। এর আগে গত ৭ জুন নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মিন্নি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তোরে ভুলে যাওয়ার লাগি আমি ভালোবাসিনি সব ভেঙ্গে যাবে এভাবে ভাবতে পারিনি তুই ছাড়া কে বন্ধু হায় বুঝে আমার মোন তুই বিহনে আর এ ভুবনে আছে কে আপন?’ পুলিশসূত্রে জানা গেছে, হত্যাকারী দুজনের মধ্যে একজনের নাম একজন এই নয়ন বন্ড (২৫)। অন্যজনের নাম রিফাত ফরাজী। তারা দুজনই অপরাধজগতের বেশ পরিচিত মুখ বলে জানিয়েছে বরগুনা পুলিশ। স্থানীয়রা এ দুই সন্ত্রাসীর তাণ্ডবে বেশ অতিষ্ঠ বলে জানিয়েছেন। তাদের ভয়ে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিলেন না। প্রায়ই নানা অজুহাতে লাঞ্ছিত হতেন স্থানীয়রা। প্রতিবেশীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করত এ দু’জনের নাম শুনলে। এলাকাবাসীর ওপর এসব অত্যাচার করে বিভিন্ন সময় তাদের জেল খাটতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কিন্তু খুব অল্প সময়েই হাজত থেকে বের হয়ে আসতেন অদৃশ্য কারণে। আর ফিরেই তাদের তাণ্ডবলীলার পরিমাণ আরও বেড়ে যেত। এ ঘটনার অন্যতম আসামি রিফাত ফরাজীর বিষয়ে পুলিশসূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন খুনি রিফাত ফরাজী। নানা ছুঁতোয় স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর করা ছিল রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব ঘটনায় কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় রিফাতকে। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করেন রিফাত ফরাজী। ভুক্তভোগী তরিকুল বলেন, সামান্য এক বিষয়ে রিফাত ফরাজীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ি। ওই সময় রিফাত ফরাজী তাকে কুপিয়ে যখম করার হুমকি দেন। সেই ভয়ে আমি দেড় মাস রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে যাইনি। কর্মস্থল থেকে প্রতিদিন আধা কিলোমিটার পথ ঘুরে বাসায় যাওয়া-আসা করতাম। তিনি যোগ করেন, হুমকি দেয়ার দেড় মাস পার হয়ে গেলে এ নিয়ে আর কোনো ভয় নেই ভেবে আধা কিলোমিটার না ঘুরে একদিন সন্ধ্যায় রিফাতের বাসার সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম। আর সে সন্ধ্যায়ই দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আমায় মাথায় গুরুতর যখম করে রিফাত। একই বছর মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটক হয় রিফাতের বাবা। স্থানীয় পুলিশ জানায়, রিফাত বরগুনার হোমিও চিকিৎসক ডা: আলাউদ্দিন আহমেদের ডিকেপি রোডের বাসার ছাত্র মেসে যান এবং অস্ত্রের মুখে সব ছাত্রকে জিম্মি করে তাদের ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ রিফাতের বাবাকে আটক করে মোবাইলগুলো উদ্ধার করেন। এ বিষয়ে ডা: আলাউদ্দিন আহমেদের ছেলে ডা: মো: মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ‘রিফাতের কাছ থেকে ছিনতাই করা ১৪টি মোবাইলের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করা হয়। আর বাকি তিনটি নতুন মোবাইল কিনে দিলে থানা থেকে রিফাতের বাবাকে ছেড়ে দেয়া হয়।’ এ ছাড়া রিফাতের জন্য দামি, আকর্ষণীয় মোবাইল ব্যবহার করতে ভয় পেতেন এলাকাবাসীর অনেকেই। কারও হাতে দামি স্মার্টফোন দেখলেই সেটি ছিনতাই করতে উদ্যত হতো রিফাত। বিদেশ থেকে প্রাইম মডেলের একটি স্যামসাং মোবাইল মেহেদী নামের এক যুবকের থেকে ছিনিয়ে নেয় রিফাত। পরে সেই সেট ফিরিয়ে দেয়া নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যার হুমকি দিত রিফাত। প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছাড়েন মেহেদী। এমনটাই জানালেন মেহেদীর বোন বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মারজানা মনি।
বরগুনায় স্ত্রীর সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নির সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের বিয়ে হয়েছিল। তাদের বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাজী মো: আনিসুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি বরগুনা পৌরসভার ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্টার। বরগুনা পৌরসভার ডিকেপি রোডের কেজি স্কুল নামক স্ট্যান্ডে তার অফিস। নয়ন বন্ডের ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বিয়ের প্রথম স্বাক্ষী রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় আসামি বাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজি। গত বছরের ১৫ অক্টোবর আছরের নামাজের পর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের দেনমোহর হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। তবে দেনমোহরের কোনো নগদ পরিশোধ ছিল না। কাজী মো: আনিসুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বিয়ে করার জন্য নয়ন ও মিন্নিসহ ১৫ থেকে ২০ জন লোক আসে আমার অফিসে। এসময় নয়ন ও মিন্নি তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে আসে। এরপর আমি মেয়ের বাবার সঙ্গে কথা জানতে চাইলে তারা বলে, মেয়ের বাবা আসবে না, আপনি মেয়ের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর মিন্নির মা পরিচয়ে একজন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি আমাকে বলেন, বিয়ের বিষয়টি আমরাতো জানি। মিন্নির বাবা বিয়েটা এখন মানবে না। আপনি বিয়ে সম্পন্ন করেন। বিয়ের কিছুদিন পর ঠিকই মেনে নেবেন। এরপর আমি পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে নয়ন ও মিন্নির বিয়ে সম্পন্ন করি। এ বিয়ের উকিল ছিলেন শাওন নামের একজন। শাওন ডিকেপি রোডের মো: জালাল আহমেদের ছেলে। অথচ এর আগে মিন্নি বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে একমাত্র রিফাত শরীফের সঙ্গে। এছাড়া আর কখনো কারও সঙ্গে বিয়ে হয়নি। যেহেতু বিয়েই হয়নি, ডিভোর্স হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। রিফাতই আমার স্বামী এবং এটাই সত্য। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি করি, যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। বরগুনায় নিহত রিফাতের আসল খুনি বা খুনের আসল পরিকল্পনাকারী কে!-এমনটাই প্রশ্ন এখন জনমনে।