|
নারীকাণ্ডে বিতর্কিত জামায়াতের এমপি (সাতক্ষীরা-৪) গাজী নজরুল
ন্যাম ভবনে এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু
মুক্তখবর ডেস্ক রিপোর্ট : নারীকাণ্ডে বিতর্কিত জামায়াতের এমপি (সাতক্ষীরা-৪) গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার সরকারি ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তাঁর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন। আসামি করা হয়েছে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী এবং মরিয়ম খাতুনের মামা ওবায়দুর রহমানকে। ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান জানান, এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তার দেখাতে আজ জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আবেদন জানানো হবে। পুলিশ বলছে, ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস লাগানো অবস্থায় ছিলেন ওই তরুণী। ঠিক কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি আত্মহত্যা করলে সেটার কী কারণ তা-ও জানাতে পারেনি স্বজনরা। ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি পেছনে অন্য রহস্য আছে জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট। নেমেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশও। লাশ উদ্ধারের সময় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের কাছে তিনি স্ত্রীর মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেননি। একই বাসায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমও থাকতেন বলে জানা গেছে। ঘটনার সময় গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বাসায় থাকায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। মারা যাওয়া মরিয়ম খাতুনের সঙ্গেই আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার হন গাজী নজরুল ইসলাম। ডিসি মো. ইবনে মিজান জানান, মরিয়মের লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে এমন খবর পেয়ে পুলিশ উদ্ধার করে। গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত চলমান । ডিসি আরও জানান, তদন্তের স্বার্থে প্রাথমিক অবস্থায় সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। সিআইডি ক্রাইম সিন টিম রিপোর্ট হস্তান্তর করার পর বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুল করিম বলেন, রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তারা খবর পেয়েছেন। ঘটনা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ঘটেছে। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় এমপি গাজী নজরুল একই ফ্ল্যাটের পাশের একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর সোয়া ২টায় এমপি নজরুল বাসায় আসেন। তিনি দুই স্ত্রীকে নিয়ে দুপুরের খাবার খান। এরপর আলাদা কক্ষে যান। বিকাল ৫টার পর মরিয়মকে ডাকতে গিয়ে তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ দেখতে পান গাজী নজরুল। পরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে মরিয়মকে ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন। এরপর বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। সন্ধ্যায় ন? ন্যাম ভবনের নিচে গণমাধ্যমকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান জানান, ‘গাজী নজরুল ইসলাম আমার ভাগনিকে (মরিয়ম) নিয়ে সংসার করছেন বলে জানতে পারি। গাজী নজরুলের মন আরেক রকম, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। তদন্তে কী উঠে আসে আমরা সেই অপেক্ষায় থাকব।’ ওবায়দুর বলেন, মিথ্যা জিনিস (বিয়ে) সত্য করে চাপিয়ে দিয়ে সংসার করাচ্ছিল মরিয়মের পরিবার। আগে যখন ন্যাম ভবনে গেছি তখন প্রথম স্ত্রীকেও নিয়ে থাকতে দেখেছি। মরিয়মের আত্মীয় মীজানুর রহমান বলেন, বড় বউ ন্যাম ভবনের বাসায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম সব সময় থাকত। কয়েক দিন আগে মরিয়মের মামা ওবায়দুর আমাকে বলেছিল, মরিয়ম ওখানে থাকতে চাচ্ছে না। গাজী নজরুলের সঙ্গে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। যেহেতু মরিয়মকে সামাজিকতার জন্য মেনে নিয়েছেন গাজী নজরুল। সেহেতু প্রশ্ন আসে, চাপে পড়ে মেনে নেওয়া আর স্বাভাবিকভাবে সংসার করা অন্য জিনিস। মীজানুর রহমান আরও বলেন, গাজী নজরুলের গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জু সরদার ও সোবহান গাজী গতকাল ওই বাসায় গিয়েছিল। উনাদের বাসায় রেখে গাজী নজরুল আদালতে যান। আগাম জামিনের ৮ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই কেন তিনি গতকাল আদালতে গেলেন এবং ওই দিনই কেন মরিয়ম মারা গেল? এ ছাড়াও আমরা একটি ভিডিও পেয়েছি, পায়ের সঙ্গে চেয়ার। ফাঁস নিলে ছটফট করে চেয়ার তো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার কথা না। এসব বিষয় সন্দেহ করছি-মরিয়মকে হত্যা করা হতে পারে। এ ঘটনার পর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ ডাবলু। এক বিবৃতিতে তিনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন এ বিএনপি নেতা। গতকাল গাজী নজরুল ইসলাম দ্বিতীয় স্ত্রীর মামার করা হত্যাচেষ্টা মামলায় হাই কোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর ঢাকার আদালতে জামিননামা দাখিল করেছেন। ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে জামিননামা দাখিল করেন তিনি। জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট এ মামলায় হাই কোর্ট থেকে ৮ সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম। গতকাল সেই জামিননামা দাখিল করলেন। এ মামলার বাদী ওবায়দুর রহমান গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও মারা যাওয়া দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মামা। এর আগে অনৈতিক সম্পর্কের ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে গত ২১ জুলাই গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলাটি করেন। মামলার আসামিরা হলেন-গাজী নজরুল ইসলাম, আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসান। মামলায় উল্লেখ করা হয়, বাদী ওবায়দুর রহমান পল্লবীর কালশী এলাকার রোজ গার্ডেন টাওয়ারে তার বোনের বাসায় বসবাস করতেন। তিনি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। এক পর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগনির অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুর তার পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ইসলাম তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। বাদীর অভিযোগ, সম্প্রতি মগবাজারের একটি চক্র নজরুল ইসলাম ও তার ভাগনির কিছু অপ্রীতিকর ভিডিও সংগ্রহ করে নজরুলকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। নজরুল ইসলামের ধারণা হয়, ওবায়দুরই গোপন ভিডিও ধারণ করে সংবাদমাধ্যম ও ওই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ নিয়ে বিরোধের জেরে গত ১৪ জুলাই নজরুল ইসলামের নির্দেশে অন্য আসামিরা ওবায়দুরের ওপর হামলা চালায়। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওবায়দুর বলেন, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে আসামি আমিনুর রহমান তাকে কৌশলে ড্রয়িংরুমে ডেকে নেন। সেখানে অন্য আসামিরা মিলে তাকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। এক পর্যায়ে আমিনুর তাকে ফ্লোরে ফেলে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করেন। আহত অবস্থায় ওবায়দুর স্থানীয় কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। গত জুলাইয়ে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হলে জামায়াতে ইসলামী ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কার আদেশে বলা হয়, দলীয় তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণ হয়েছে। গাজী নজরুল দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং তারা ১৭ জুন বিয়ে করেছেন। যদিও অভিযোগ ওঠে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন গাজী নজরুল। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটিপতি বানানোর প্রলোভনও দেখিয়েছিলেন তিনি।
Post Views: ০
|
|